কাঁটাতার( ছোটো গল্প)
সুমিতা চৌধুরী
অশীতিপর মেঘনাদবাবুর কানে কথাগুলো সমানে বাজছে, " স্যার, কাগজপত্র সব সামলে রেখেছেন তো? জেনুইন না হলে মুশকিল । বুঝতেই পারছেন, এই বয়সে এসে দেশ ছাড়তে হলে খুবই মুশকিল । কিন্তু কিছু তো করার নেই । দেশের ব্যাপার বলে কথা। আর এবার খুব কড়াকড়ি হচ্ছে, আর হওয়াটাও উচিৎ। দেশটা উচ্ছনে যাওয়া থেকে বাঁচাতে হবে তো। যতোই আগুন জ্বলুক। আন্দোলনের নামে যা খুশি তাই মেনে নেওয়া যায় না । দেশটা আমাদের । দেখছেন তো দিল্লীর হাল। আরো হবে। সব জায়গায় হবে । এইসব আন্দোলন টান্দোলন আর বরদাস্ত করা হবে না । এবার পুরোপুরি রাম রাজত্ব আসবে স্যার।ভালো থাকবেন, একটু সাবধানে থাকবেন। " এই কথাগুলো মেঘনাদবাবুকে বহুবছর পুরোনো হাড়হিম করা কিছু মর্মান্তিক ঘটনাকে যেন পরপর সাজিয়ে দিচ্ছে তাঁর চোখের সামনে ।
ভারতবর্ষ সবে ভাগ হয়েছে । দুইপারেই চরম দাঙ্গা । কাল অবধি যারা ছিল বিপদে আপদে সাথী,দোসর,ভাই, আজ তারা ধর্মের ভিত্তিতে চরমতম শত্রু, শিকারী আর শিকার। সেই বিভীষিকাময় দিনে এক ভরদুপুরে কোনো এক কালসাপ ঠিক এভাবেই হিসহিসে গলায় এভাবেই প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছিল তাঁর বাবাকে । কাকতালীয় ভাবে সেই কালসাপটিও ছিল আনন্দমোহন ( মেঘনাদবাবুর বাবা) বাবুর ছাত্র। সেদিন রাতে মেঘনাদবাবু তাঁর বাবার চোখে মুখে শুধু আতঙ্ক নয়,যে দুর্বিষহ ঘৃণা এবং নিজের প্রতি ধিক্কার দেখেছিলেন তা এখনো এতোটুকু ভোলেননি তিনি । ভুলতে পারেননি, সেই রাতে তাঁর মাকে বলা বাবার কথাগুলো । " এতোদিন শুধু শুনছিলাম, চারিদিকে খুন-জখম-রাহাজানি । আর আজ সচক্ষে দেখতে হলো। তাও নিজের একসময়ের ছাত্রই এসব ঘটিয়েছে, আবার গর্বের সাথে বলছে। উঃ আর ভাবতে পারছি না । এখনো বমি আসছে আমার । ঘাটে বসে রক্তে মাখা একটা কামিজ ধুচ্ছিল, আর হাসতে হাসতে বলছিল," আজ নোয়াখালীর ঐদিকে কয়েকটাকে নামিয়ে এলাম। বড্ড খারাপ পরিস্থিতি মাস্টারমশাই । থাকতে পারবেন তো? তবে মাস্টারমশাই, এখন দেশটা আমাদের । ভাগ যখন হচ্ছে, সোজাসুজি হওয়াই ভালো । হিন্দুস্থান, পাকিস্থান । আল্লাহ্ মেহেরবান। দেখুন না, কামিজটা গন্দা খুন লেগে নোংরা হয়ে গেছে । তাই ধুতে এসেছি। সাবধানে থাকবেন, আবহাওয়া ভালো নয়।" আমার সামনে দাঁড়িয়ে এতোগুলো কথা বলে গেল হারুন আজ। অথচ কিছুদিন আগেও আমায় দেখলে সম্মানের সাথে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতো । মাথা নিচু করে কথা বলতো। নাঃ, আর সত্যিই থাকা যাবে না এখানে । ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতেই হবে । কোন ভরসায় থাকবো? আপনজনেরাই যখন শত্রু হয়ে গেছে!" ঠিক এর দু'দিন যেতে না যেতেই এক ভয়ঙ্কর রাত হানা দিয়েছিল । একটি লোক টাঙ্গির কোপে অর্ধমৃত অবস্থায় রক্তে ভেসে যেতে যেতে কোনোক্রমে আনন্দমোহনবাবুদের বাড়ির দরজায় মুহুর্মুহু আঘাত করে প্রাণভিক্ষা চাইছিলেন । আনন্দমোহনবাবু ঐ অবস্থায় কারো কথার পরোয়া না করে সেই মুমূর্ষু মানুষটির প্রাণরক্ষার স্বার্থে অমনদিনেও নিজের তথা সবার প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সদর দরজা খুলে দিয়ে তাকে অন্দরে নিয়ে এসেছিলেন। পিছনে ধাওয়া করা নরখাদকের দল তখন সোল্লাসে চিৎকার করতে করতে আসছিল । আনন্দমোহন বাবুদের বাড়ির সামনে রক্তের দাগ দেখে বুঝে গিয়ে শাসিয়ে গিয়েছিল, " বোঝাপড়াটা আমাদের মধ্যে হতে দিন মাস্টারমশাই । আপনি হস্তক্ষেপ করবেন না । ফলটা ভালো হবে না । ওকে আশ্রয় না দিয়ে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন।" বন্ধ দরজার এপাশ থেকে চরম উৎকণ্ঠায়ও দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন তিনি, " আমার প্রাণ থাকতে নয়।" সবথেকে হাড়হিম করা কথাটা তখনই ভেসে এসেছিল, " তাহলে নিজের প্রাণটা এবার বাঁচাবার ব্যবস্থা করে নিন। দেশের অবস্থা কিন্তু ভালো নয়। একটা কথা কি জানেন তো,"আপনে বাঁচলে বাপের নাম।" হাঃ,হাঃ, হাঃ, হাঃ। " রাতে খানিক শুশ্রূষা পেয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই মৃতপ্রায় ব্যক্তি হাতের মুঠোয় রাখা প্রাণখানি বাঁচাতে যেন কোথায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, হয়তো নিজের জন্য, হয়তো কিছুটা কৃতজ্ঞতা স্বরূপ । আর কৃতজ্ঞতা স্বরূপই যাওয়ার আগে বারবার কাকুতি মিনতি করে বলে গিয়েছিল আনন্দমোহন বাবুর পায়ে ধরে," কত্তা ওরা ছাড়বে না। আপনি চলে যান । আপনার তো ইন্ডিয়াতে খুড়তুতো ভাইরা আছে। চলে যান সেখানে । এখানে আর কিচ্ছু নাই,কেউ নাই। পড়ে থেকে কোনো লাভ নাই । মায়া ত্যাগ করুন । এখানে থেকে ছেলেপুলে নিয়ে মরবেন না। কেউ বাঁচবে না, ওরা কাউকে বাঁচতে দেবে না।চলে যান কত্তা,চলে যান ।" সে রাতের ঘটনার পর আর একদিনও কেউ নিশ্চিন্তে দু'চোখের পাতা এক করতে পারেনি। ত্রাস পিছু ধাওয়া করে ফিরেছে সবসময় । যা যতোটুকু রান্না করতেন মেঘনাদবাবুর মা, তা সেই বেলাতেই খাইয়ে দিতেন চোখের জল আগলে। যদি পরের বেলায় কেউ চিরতরে চলে যায় চোখের সামনে । আনন্দমোহনবাবুরও সাহস, আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকেছিল । ঐ ঘটনার পরদিন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল ইণ্ডিয়াতে আসার প্রস্তুতি । কপর্দকশূন্য হয়ে দলে দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন উপায়ে তাঁরা এসে পৌঁছেছিলেন শেষমেষ কাঁটাতারের এপারে ইণ্ডিয়ায়। মেঘনাদবাবু তাঁর দিদির সাথে এসেছিলেন । নৌকা, ট্রেন সর্বত্র ত্রাস। এই বুঝি হায়নার দল ধরে ফেলল। আর বুঝি প্রাণ বাঁচানো গেল না। আর তেমনি সর্বত্র ভিড়। তিলধারনের জায়গা নেই বললেও কম বলা হবে। নৌকা মানুষের ভারে ডুবে যাওয়ার উপক্রম । ট্রেনে মানুষদের যেন গরু ছাগলের মতো গাদাগাদি করে ভরে দিচ্ছিল । খাবার তো নেইই, জল পর্যন্ত নেই একবিন্দু। ভয়ে, তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে মরুভূমি । তার মধ্যে গনগনে রোদে মাইলের পর মাইল হাঁটা। প্রায় তিনদিন পর এপারের এক হোটেলে এসে মেঘনাদ বাবুরা খাবার সন্ধান পেয়েছিলেন । জীবনে ঐ একবারই তিনি মর্মে মর্মে বুঝেছিলেন অমৃত কাকে বলে। চালটা শুধু একবার ফুটেছে সেই ভাত, জলের মধ্যে একবিন্দু হলুদ দেওয়া ডাল আর প্রায় কাঁচা বাঁধাকপি ও আলুর তরকারি । তিনদিন পর খিদে মেটানোর ঐ অমূল্য সামগ্রী অমৃত না হলে, আর কোনটা হবে অমৃত? শুধু তাই নয়, তার সাথে ছিল কিছুটা হলেও প্রাণরক্ষার আশ্বাসটুকু।
তারপরের সংঘর্ষ অবশ্য আরো কঠিন ছিল । পায়ে পায়ে বিপদ, চরম বিড়ম্বনা, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, যন্ত্রণা, অপমান, অসম্মান, হতাশা পার করে মাটি আঁকড়ে বেঁচে থাকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার লড়াই প্রতি মুহূর্তে । আনন্দমোহনবাবুর অদম্য চেষ্টায় আস্তে আস্তে পায়ের তলার জমি ফিরে পাওয়া । কিন্তু গায়ে আঁটা ঠাট্টার/ আদরের ডাক " বর্ডার ক্রস করা বাঙাল", " বেড়া টপকানো মাল" তকমাটা ঘোচাতে পারেননি এখনো এদেশে শিক্ষকতা করার সুবাদেও। তৎকালীন আনন্দমোহনবাবু ও পরবর্তীতে মেঘনাদবাবুরও বার বার মনে হয়েছে বর্ডার/ কাঁটাতার কোথায় ছিল? সবটা মিলেই ছিল একটাই দেশ, ভারতবর্ষ । সবাই ছিল ভারতবাসী । তাহলে বর্ডারটা কি ছিল মানুষের মনে? নাহলে কোলাকুলিটা এতো তাড়াতাড়ি দলাদলিতে পরিণত হলো কি করে? এইসব প্রশ্ন মনের মাঝে সাথী করেই মেঘনাদবাবুদের খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে ওঠা। এবং চার ভাই নিজ নিজ চেষ্টায় সংসারের সামান্য হাল ফেরাবার আগেই মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রমে আনন্দমোহনবাবুর অকাল প্রয়াণ । ফের লড়াই অভিভাবকহীন সংসারের নতুন করে হাল ধরার। একসময় মেঘনাদবাবুও উত্তরাধিকার সূত্রে না হোক, রক্তের ধারায় ও জিনগত পরিকাঠামোয় এবং সর্বাগ্রে মানুষ হওয়ার সুবাদে বাবার মতোই শিক্ষকতায় মনোনিবেশ করলেন । সেই সূত্রেই তিনিও সবার কাছে পরিচিত মাস্টারমশাই বা স্যার রূপে বাবার মতোই আজ।
আজ সেই একই দিন, যেদিন মেঘনাদ বাবুরও নিজের প্রতি, নিজের কাজের প্রতি ধিক্কার জন্মাচ্ছে । তিনি তাহলে কি শিক্ষকতা করলেন? সঠিক মানুষ তৈরী করতে পারলেন কই? কাঁটাতার তো আজও গলার কাঁটা হয়েই বিঁধে আছে । আজও ইংরেজ অলক্ষ্যে হাসছে" ডিভাইড রুলস" এর গর্বে। হ্যাঁ তারা পেরেছে সমূলে বিচ্ছেদ ঘটাতে ভাইয়ে ভাইয়ে । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাখি, শত শত বিপ্লবীদের বলিদান, সর্বোপরি স্বাধীনতা নিছকই উপহাসের পাত্র আজ সব। আরো এক বর্ডারে ভাগ করে কাঁটাতার বসিয়ে ইণ্ডিয়ার সাহায্যে গড়ে উঠেছিল আর এক টুকরো নতুন দেশ, বাংলাদেশ । হিন্দুস্থান, পাকিস্থানের থেকে আলাদা হয়ে বাংলা ভাষাভাষীদের দেশ। বাঙালি হওয়ার সদর্প ঘোষণায় যাদের করতে হয়েছে বারবার রক্তক্ষয়,দিতে হয়েছে বহু বলিদান । কিন্তু বাংলা সে তো কেবল ভাষা মাত্র। আসল তো জাত পাত ধর্মের বিভেদ । কে হিন্দু, কে মুসলমান । তা থেকে কি মুক্ত হতে পেরেছে কেউ আজও এতোগুলো টুকরো হওয়ার পরেও? না। তাই কাঁটাতারের দুইপারেই চলে সন্ত্রাস । কোথাও হিন্দু প্রাধান্য পায়, কোথাও মুসলিম প্রাধান্য পায় । মানুষ হিসেবে মানবিকতার কোনো দাম নেই আজ আর। তাই নিরপেক্ষতারও স্থান নেই কোনো । আসলে মানুষের মননে, চেতনে, আত্মায় বসেছে কাঁটাতার। ইংরেজ আজো কাঁটাতারের মাধ্যমেই অধীন করে রেখেছে সমগ্র ভারতবর্ষ তথা তিন তিনটে দেশ। নাহলে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেরও পরে নাগরিকত্বের অধিকার জন্মায় না কারো? গণতন্ত্রের সর্বাধিক প্রয়োগ ভোটাধিকার কি তাহলে শুধুই তামাশা মাত্র? নাকি, প্রয়োজনে ব্যবহার? প্রয়োজনে প্রিয়জন হয়ে ওঠা?সেই দুর্দিনে কোনোমতে প্রাণ বাঁচানো অধুনা বৃদ্ধ মানুষগুলো কোথায় পাবে তাঁদের বৈধ নথিপত্র? আর কতোবার আগুন জ্বলবে মানুষের লালসার ? ধর্মের নামে, লালসায়, ক্ষমতার কাঁটার বীজ যদি মানুষের মনে না থাকতো, তবে এতো সহজে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি শুধুমাত্র কাঁটাতার বসিয়ে একই সংসারের দুইভাইকে চিরশত্রু বানাতে পারতো না।যদি সত্যি স্বাধীনতা আসতো তবে এভাবে বিভৎস দাঙ্গার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতো কি? এই কাঁটার মুকুট পরে আদৌ স্বাধীনতা এসেছিল কি????
ReplyForward
|

No comments:
Post a Comment