Friday, May 1, 2020

বেদান্তের লকডাউন পর্বে লিখছেন আইরিন সুলতানা আইভি

''একদিন হারিয়ে যাব"
         আইরিন সুলতানা আইভি      

হারিয়ে যাবো,
একদিন সব ছেড়েছুঁড়ে উধাও হবো কোনো সকাল না হওয়ার দেশে।

আমার তো কোনো কথা বলার ছিলো না, আমি তো বরফের মতন একটা
 অশ্রু-জমাট  মন  দুটো চোখ নিয়েই ছিলাম তোমাদের মাঝে কতকাল।

এই মেদিনীর মাঝে আমি তো কোনো বিখ্যাত দুঃখবাদী কবি কিংবা  দুখের সুর বাদক  হতে আসিনি। 
নিজস্ব দুঃখ বিলোবো কার দ্বারে?
এ জগতে কার বুকে ভার কম!
হয়তো  কখনোসখনো 
ভায়োলিন বাজিয়েছি, তাও তোমাদের উৎসুক চোখের জিজ্ঞাসার বানে থেমে গেছে কতবার। তাতেও 
আফসোস কিছু নেই,
থাকার মধ্যে কেবল এটুকুই  
এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানবের দুদণ্ড একলা যাপনের কোনো ফুরসত নেই। 
অথচ এও মিথ্যে নয় দিনশেষে সকলেই একা নিঃসঙ্গ। 
 নির্জনতার নাকি অভাব নেই, 
কত অরণ্য সাগর পর্বত 
অথচ  চিৎকার করে মিনিট দশেক একাকী  কান্নার মতন একটা জায়গা মেলে না, 
যেখানে মানুষ বুকের ভার ভাঙতে পারে।
শরীরে বেঁচে থেকেও যারা মনে মরে আছে  পুরোনো মৃত্যুর মতন,  
শীতল শোকের অন্তর পোড়ার দুঃখ
যারা অহোরাত্র বয়ে চলে,
নিত্য থেকেও যারা হারিয়ে গেছে কোনো প্রিয়তম সুখ-সম্পদ  হারানোর সাথে;
সেসবের খবরে যখন ভারী হয় না জগতের  বুক, 
ব্যত্যয় ঘটে না তোমাদের প্রাত্যহিক নিয়মে;
 সেখানে আমি  নির্বাসনে গেলে কার কী ক্ষতি হবে, বলো সময়? 

কবিতার শান্ত শব্দের  শক্তিতে তোমাদের দুলিয়ে ফুলিয়ে কাঁপিয়ে কাঁদিয়ে আন্দোলিত করতো যেই কবি, 
সৃষ্টিশীল ওই মানুষটি কতটা অন্যায্যতা পেয়েছেন 
কতটা অধিকার ছেড়েছেন 
কত অত্যাচারিত হয়েছেন 
কতদিন অভুক্ত থেকেছেন  
জীবদ্দশায়, 
জানো?
 কেবল তোমাদের  সত্যবাণী শোনাবেন বলে।
প্রাণ থাকতে যাঁর দুঃখে মানুষের অশ্রু শান্ত পুকুর জলের মতো স্থির,
জীবনাবসানে মানুষের মন কেন কাঁদবে?
পুষ্পের বোঝা কফিনের কাছে অসহনীয়!
মরণোত্তর তাঁর পদক উইপোকারাও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। 
কর্ণে 
পৌঁছেনি আমাদের, 
ঘোষিত সেই তেজালো  ভয়ংকর বাণী? 
হায় আফসোস! 

 যেই শিশুটার বুকের হাড় ফুলে উঠে প্রতিবাদ জানায়। 
অনাহার দরুন ক্রমশ  চোখ ঢুকে যায় অক্ষিকোটরে, সেখানে হয়তো শতেক ঘৃণাও থাকে নৈবেদ্য স্বরূপ উৎকর্ষিত চাকচিক্য  সভ্যতার তরে। 
লুকাতে চায় কোনো গহ্বরে
 যেখানে মাইক্রোফোনের মানবতার ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনের বাণী না পৌঁছায়,  
কেজি দরে বিকিকিনি  হতে  না দেখা যায় নামকরা 
শীর্ষ শান্তি সংঘের কোনো হাট বাজারে । 
অনাহারী অপাপবিদ্ধ যেই শিশুর আর্তনাদ, সকরুণ টলমল  চোখ জোড়া 
টকটকে তাজা লোহু বিশ্ববিবেকে রেখাপাতে ভীষণরকম ব্যর্থ 
সৈকতে 
উপুড় হয়ে পড়ে  থাকা শিশুর জন্য কেন কান্না হবে? 
 এক টুকরো  পুষ্প-প্রাণ তোমাদের  অশ্রুকে 
ভৎসনা জানিয়ে গেছে  
 নিথর শরীর দ্বারা; 
তোমরা বললে, 'শিশুটির মৃত দেহ পড়ে আছে',
অথচ আমি দেখলাম-- 
ওটা কেবল দেহ নয়, ওটা ছিলো একটা 
 প্রতিবাদ,  
ওই জীবনাবসান কেবল মৃত্যু নয়,  বিশ্ববিবেকের মুখে ক্ষুদ্র পায়ের কষে  একটা পদাঘাত। 

এই মেদিনীর মাঝে আমি তো কোনো বিখ্যাত  দুঃখবাদী কবি হতে আসিনি।
না কোনো দুখের সুর বাদক।
নিজস্ব দুঃখ বিলোবো কার দ্বারে? 
এ জগতে কার বুকে ভার কম? 
সময়, 
ছাড়পত্র দাও, পায়ের শেকলটাকে খুলে ফেলি।

No comments:

Post a Comment