Sunday, May 3, 2020

কাশ্মীরি সাহিত্য মুস্তাক বি বার্ক এর লেখা একটি গল্প



শাস্তি

মুস্তাক বি বার্ক

লোহার কপাটের পেছনে কুঁচকানো ঝাড়, ড্যানিশ একটি উলটানো গাঁদার মতো নিচু হয়েছিল। তাঁর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলো তাঁর মাথার টাকের মতোই প্রকাশ হীন ভাবে পড়েছিল। তাঁর মাথাটা দুটো ভঙ্গুর বাহুর মাঝে কোনক্রমে রাখা ছিলো। পেছন থেকে তাঁর কাঁধের দিকটা দিকে মনে হচ্ছিল যেন পাহাড়ের ওপরে, কোন উপত্যকায় বোম  ফেলার পর যেমন বিধ্বস্ত হয়ে থাকে ঠিক সেরকম। তাঁর সারা শরীরের জরাজীর্ণ ধ্বংসস্তূপের ওপর টাক মাথাটা অক্ষত অবস্থায় নিজের উপস্থিতির জানান দিচ্ছিল। তাঁর দুটি নগ্ন বাহুর মাঝে তাঁর অক্ষত মাথাটি যেন মৃত্যু উপত্যকায় আশার আলো হয়ে জাগ্রত ছিলো।

কয়েকটা লোহার কপাট ড্যানিশকে সারা বিশ্ব থেকে আলাদা করে রেখেছিল। তাঁর উপস্থিতিটা ছিল অনেকটা একটি আধুনিক চিত্রের মতো, যেখানে তাঁর মাথা একটি ফ্রেমে আর বাকি অঙ্গ গুলো অন্যান্য ফ্রেমের মধ্যে বন্দী করা হয়েছিল। তাঁর সমগ্র শরীরের এক একটি অঙ্গ এক একটি আলাদা চিত্রের মতো অনেক কিছু জানান দিচ্ছিল। লোহার কপাট গুলি এক একটি আলাদা ফ্রেমের মতো তাঁর শরীরের অঙ্গ গুলিকে সচল এবং অচল এই দুটি ভাবে বিভক্ত করে ফেলেছিল।

এই অন্ধকার কুঠুরি যেন একটি মৃত্যু উপত্যকা, এই মৃত্যু উপত্যকা থেকে জীবনের সাথে যোগাযোগ করার একমাত্র মাধ্যম ছিল তাঁর কুঁচকানো মাথার ওপরের ছোট্ট একটি জানালা। যেখান থেকে ছিটেফোঁটা জীবনের আলো এসে উঁকি দিয়ে যেতো। এই কারাগারের প্রতিটি দেওয়ালের পেছনে নির্যাতনের এক একটি ভয়ংকর চিত্র ছিলো, ড্যানিশের চিত্রটা ধীরে ধীরে আবঝা হয়ে মুছে যাচ্ছিল।

তাঁর কুঠুরির কপাট গুলো মরচে ধরে এমন অবস্থা হয়েছিল, যা তাঁর ওপর যে নির্যাতন চলেছে তাঁর প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাঁর শরীরটা জঞ্জালের মতো এক কোনায় পড়েছিল। চারপাশ দিয়ে মানুষের মলমূত্র স্রোতের মতো বইছিল। নোংরা দমবন্ধ করা গন্ধের মাঝে বমির শব্দ আবহ সঙ্গীতের মতো কাজ করছিল। কোনরকম বিচার ছাড়াই নিরপরাধ ড্যানিশকে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছিল।

তাঁর আপাত দৃশ্য মৃত শরীরের ভেতরে অত্যন্ত গভীরে প্রাণের স্পন্দন এক সরু নালার মতো বয়ে চলেছিল। তবে এই ভয়ঙ্কর অত্যাচার সহ্য করেও যে সে জীবিত ছিল, এটা তাঁকে এক অবতারে পরিণত করেছিল। কারন একজন অবতার ছাড়া কারুর পক্ষে এইভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিলো না। তাঁর উপস্থিতিটা ছিলো অনেকটা এক বিশাল বট গাছের নীচে এক ধ্যানস্থ মহামানবের মতো, যে ধ্যানস্থ অবস্থায় নিজের অস্তিত্বকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিল। তাঁর চারপাশে প্রহরীদের উপস্থিতিটা অনেকটা বিষ বৃক্ষের ছায়ার মতো, যার বিষাক্ত উপস্থিতি একজন নিরপরাধ, অসহায় মানুষকে শয়তানের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করে। কিন্তু ড্যানিশ সব অত্যাচার সহ্য করে এক ধ্যানস্থ যোগীর মতো পড়েছিল।

দুপুরবেলা একজন প্রহরী একটা স্টিলের লাঠি দিয়ে কপাট গুলোতে আঘাত করলেন। রোজ দুপুরের খাবার দেওয়ার আগে এই প্রহরীর আগমন হতো। ড্যানিশ মাথা তুলে সেই প্রহরীর দিকে তাকানোর চেষ্টা করলো, সে তাঁর হাত পা গুলো একটা নাড়ানোর চেষ্টা করে বিফল হল। কারন তাঁর সারা শরীর সেঁকল দিয়ে বাঁধা ছিল।

একটি খাবারের প্লেট তাঁর কপাটের ফাঁক দিয়ে দেওয়া হলে, সে কোনক্রমে সেটা নিজের কাছে নিয়ে আসে। প্লেটের ওপর রাখাছিল, এক মুঠো ভাত, শুঁকনো রুটি আর এক বাটি স্যুপ। ক্ষুধার্ত ড্যানিশ কিন্তু সেই খাবার মুখেও তুলতে পারলেন না, কারন সেই খাবার দিয়ে অত্যন্ত নোংরা গন্ধ আসছিল। খাবার ইচ্ছাটা প্রায় চলে গেছিল, সেই সময় তিনি সামনের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে একটা আবঝা ছবি দেখতে পেলেন। কোন এক বন্দী এই ছবিটা এঁকেছিলেন। এক মহিলা কোলে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ড্যানিশ সব কিছু আবঝা দেখছিল, কারন ভয়ংকর অত্যাচারের ফলে তাঁর চোখটাই নষ্ট হয়ে গেছিল।

ড্যানিশের মনে হল মায়ের বাহু দুটো বিশাল প্রশস্ত হয়ে গেলো, যেটা ধীরে ধীরে তাঁকে আলিঙ্গন করলো। ড্যানিশ নিজেকে বাচ্চাটার জায়গায় দেখতে পাচ্ছিল। মায়ের হাত দুটো তাঁর সারা শরীরে তাঁর স্নেহের স্পর্শে বোলাতে লাগলো। মায়ের স্পর্শে সে ধীরে ধীরে যেন সুস্থ হয়ে উঠছিল। অনেকদিন পর এরকম স্নেহের স্পর্শ পেয়ে সে কেঁদে ফেলল। মায়ের শক্ত আলিঙ্গনের মাঝে সে নিজেকে অত্যন্ত নিরাপদ মনে করছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল যেন সে মৃত, কিন্তু তাঁর পেটটা তখনো ওঠা নামা করছিল। চিত্রটা অনেকটা এমন ছিল, যেন কোন এক প্রাচীন মন্দিরের গুপ্তধনকে কোন এক সাপ রক্ষা করছিল।

এমন সময় তাঁর বাহু দুটো খুলে গেলো। এক প্রচণ্ড ধাক্কায় তাঁর সারা শরীর কেঁপে উঠল। চারিদিক অন্ধকার, সেই অন্ধকারের মধ্যে যেন সে পথ খুঁজে চলেছে। এবং সে বাইরে আসার সব রকম চেষ্টা চালাচ্ছে।

এমন সময় তাঁকে শক্ত খসখসে পাথরের মেঝের ওপর ফেলে দেওয়া হল, তাঁর মাথা প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হয়ে উঠল। শরীরের যে কটা হাড় তখনো অখণ্ড ছিল, সেগুলো ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। নিত্যদিনের মতো কয়েকজন হাতে রড নিয়ে তাঁর ওপর অত্যাচার চালাতে থাকলো।

ড্যানিশের ওপর দীর্ঘদিন অত্যাচার করতে করতে তাদের যেন একটা মায়া পরে গেছিল। তাই যখন ড্যানিশের থেকে কোন স্পন্দন তারা পাচ্ছিল না, তখন তারা কাঁদতে লাগলো। জেলার জেলের ডাক্তারকে খবর দিলো। ডাক্তার ড্যানিশকে মৃত ঘোষণা করল।



Saturday, May 2, 2020

Mushtaque B Barq's Short Story


                                                                  Punishment

                                                            Mushtaque B Barq





Drooped neck coiled behind the iron bars, Danish was down like an inert stack. His limbs like his bald head were portraying nothing__Nothing momentous.  A monotonous look of his bald head held between those frail arms appeared cemented and controlled.  His neck was naked like a freshly ravished hilltop after a bombardment to yield minerals and his forlorn bald head was a remnant after a demolition.  The mystery between the two naked hill tops was on cards as one was recounting the death of hope and the other was communicating the burdened shoulders dumped under the lumber afar resistance.  Between his knees, his bald head was strained like a sinner forcibly pushed into purgatory through a narrow and unending tunnel. His head was still, his shoulders fixed and browbeaten to a complete submission. 
A few iron bars of his cell from a distance were dividing Danish into parts. His drooped head in one of the frames, his shoulders, his knees and the feet split him into other frames. The thick angle iron administrated into those friendless iron bars was further slicing him into two halves like his conscious and unconscious being. His upper half was motionless and the lower one almost departed. Between these bars, Danish was scattered into bits beyond recognition.
The solitary window case over his drooped head was too high to be peeped through to catch a glimpse of the world outside the compressed confines. The walls were bashed, tortured, ravished and mutilated. Danish amidst this devastating record was a palpable illustration of obliteration.
A corner of his cell was jammed with a few rusted tins, almost eaten up by the rust, a few bottomless and a few brimless like his own body that had lost much of energy and enthusiasm, serving the purpose of responding to natural calls. Too shabby, too filthy like his disregarded body. The reek of human excreta had almost choked the surrounding. It was excessively pungent to force anyone to vomit continuously. Danish was like a heap of filth next to rustic tins like decomposed excreta, the worst companion of his cell. He was a prisoner in his own prison without judgment and judiciary, without crime and conclusion and more importantly without a will.
To a few Danish was an incarnation of the ethereal entity. Hidden deep into his own conscious, trying to find: Who, Why and Where of his existence. His body was still like a dead log ready to surprise even the sharpest blades, his motionless conscious was apparently out of joints yet to someone Danish was a living god in the dead cell. His consistency in maintaining the droop of his neck unfolded many mysteries. His posture was like a picture of my history book displaying a man under a massive tree peeping into his ‘being’ to extract something vital. The only difference between Danish and the man in the picture was the atmosphere. Danish was far ahead in surrendering his will than the man in the picture of my history book. The massive tree with mighty shade and freshness around would even lure devils to obey, but the stink in the cell would even compel the saints in mediation to suspend their search. Danish was more determined, more upright and more focused. His posture was holier than saints in meadows.
 At noon, a guard passed by his cell banged the iron bars with his steel cane. It was lunchtime. Danish responded by uncoiling his head. His eyes had put down the lids and face almost captivated behind the shabby beard, hard to recognize. His arms wished to stretch a bit but the iron rings slipped into his wrists denied the access. His knees were tied with an iron chain to let him never to think of moving his limbs. He was a bird held in a cage that broke his wings and destroyed his beak.
A plate was pushed into the cell; Danish somehow managed to drag it close. Dry bread and a bowl of soup with a handful of rice were all he had to rely on.  He raised his head and opened his eyes took a few morsels and wished to drink but for certain reasons could not quench his thirst. To quench his thirst means to add more stink to the already filthy corner. The unpleasant odor which even animals would like to avoid; Danish was a part of it perhaps recognizing the reality of his corporal limitations. He has risen above mediocrity as his posture was relevant enough for a seeker to know the cause of sin, its consequences and above all its significance.
Just after he had taken his lunch, he leaned against the wall to analyze the sketch on the opposite wall of his cell. A woman with a baby in her arms carved by some prisoner was the only apparent sketch amidst of numerous faded impressions. He continued to gaze at the sketch. He was absorbed into those arms; his eyelids were occasionally drooped and finally, those sunken eyes were closed.
 The arms of the mother in the sketch suddenly appeared bigger and wide which grasped Danish who was reduced to a tiny babe. A speck before a heap. Those majestic arms start stroking his head and rubbing his shoulders. His limbs relaxed after a long time as a touch of love applied balm to his wounds. He was weeping without a cry; he was silent but narrating something to her. She grasped him tight as he coiled his body which seemed under the spell of love. The movement was brisk, his legs and arms suffered regained vitality. His breathing was too slow to declare him dead, but the corner of his shirt near his belly was occasionally beating against his lean frame, giving a clue that he was still alive, active but under a spell of magic as his limbs was controlled like his mind. He appeared like a snake guarding a treasure in some remote temple, waiting for a right priest to uncoil his body to unfold the mystery of the treasure.
A jerk re-assembled his entire body, his limbs moved, his head stood firm against the wall, his chest moved briskly but his eyes continued to obey the darkness, he was still gazing at the mysteries in that darkest tunnel for the search of light to find his way out, but he was struggling to come out.
Once again his limbs dropped, but this time he was thrown to the floor of his cell, his head banged against the shabby floor, his back was so feeble that one could easily calculate the bones of his backbone. He prostrated and never stood again.
Before the dusk, Danish was not attended by anyone, but then, a routine check across his cell made some guards peep through those iron bars behind which the sinner was to be punished without cleaning his sin.
They cried at Danish, he did not respond. The jailor was informed, he opened the door of the cell, inspected Danish, called the doctor who declared him dead.




Friday, May 1, 2020

বীরেন্দ্র নাথ মহাপাত্ত্রের ধারাবাহিক উপন্যাস

শপথ নিলাম (ষষ্ঠ পর্ব )
 বীরেন্দ্র নাথ মহাপাত্র

তুহিন যখন অঞ্জনাকে পাঁজাকোলা করে ফিরছিল, সেই সময় উলটো দিক থেকে অন্ধকার ভেদ করে দ্রুত বেগে কি যেন আসছে, নিমেষের মধ্যে দুখানা বোলারো গাড়ি ওর সামনে হাজির হলো । সেই দুখানা গাড়ি জয়রামবাটি থেকে বিষ্ণুপুরের দর্শনীয় স্থান গুলি দেখবার জন্য আসছিল, কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি আসায় কোথাও না দেখে সোজা বিষ্ণুপুর টুরিস্ট লজে ফিরব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ওখান থেকে পরের দিন ভোরে দর্শনীয় স্থান গুলি দেখবে । ততক্ষণে বৃষ্টির বেগ অনেক কমে গেছে, তুহিন তার হঠাৎ বিপর্যয়ের কথা গুলি জানাবার পর তারাই দু -তিনজন মিলে তুহিন এবং হত -চেতনা অঞ্জনাকে একটা গাড়িতে তুলে নিল । গাড়ীগুলি সামান্য কিছুটা যাওয়ার পর হেমাদ্রি ও কিংকিনীকে অন্য গাড়িতে তুলে নিয়ে তাদের গন্তব্য স্থানের দিকে অগ্রসর হলো । কিছুক্ষণের মধ্যে সবাইকে তাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গাড়ীগুলি সেই লজের দিকে অগ্রসর হয়ে গেল । ওরা চারজনে বাড়িতে পৌঁছালো । বিদ্যুতের আলো কিন্তু তখনো পর্যন্ত আসেনি, তাই বাড়ির সামান্য আলোতে অঞ্জনাকে নামিয়ে সবাই মিলে তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করতে লাগল । কিছুক্ষণের মধ্যেই অঞ্জনার জ্ঞান ফিরে এল বটে, কিন্তু ততটা প্রকৃতিস্থ নয় । তাই সে অল্প আলোয় কারও মুখ না চিনতে পেরে তুহিনকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'চল ফিরে  চল সোনা ঝুরি গ্রামে, সেখানে আবার তাদের মেয়েকে নিয়ে সুখে শান্তিতে ঘর বাঁধব ,চাই না তোমার চাকুরী, বাবার দোকানকে আবার স্টার্ট করে, দিন গুজরান করতে চাই ।' তখন মামী বাধ্য হয়ে অঞ্জনাকে বলল, ' এ-কি করছিস মা, এ তো তুহিনবাবু, সে তো পদ্মা, ভাগীরথী, জলঙ্গীর সঙ্গম স্থলে হারিয়ে গিয়েছে ।' সঙ্গে সঙ্গে অঞ্জনা তুহিনবাবুকে আরো বেশি করে জড়িয়ে ধরে বলল,' তুমি জানো না মামী, এই আমার হারিয়ে যাওয়া স্বামী, ওকে যখন আজ ঝড়ের রাতে পেয়েছি, একে কোন মতে আর হারিয়ে যেতে দিব না, দেখলে তো মামী আমার সিঁথির সিঁদুরের জোর ।'
                তখন মামা ও মামী কিছু বলতে উদ্যত হলে ও হেমাদ্রি তাদের বাধা দিয়ে বলল, 'যে ঘটনা অঞ্জনা এখন ঘটিয়ে চলেছে, এটা একমাত্ৰ মোহিতের অতৃপ্ত আত্মার কারসাজি, অতএব বাধা দিয়ে আর লাভ নেই, এটাই এখন ওর ভবিতব্য । হেমাদ্রির কথা শেষ হওয়ার মুহূর্তে চারিদিকে আলো জ্বলে গেল । ঘরের মধ্যে চারিদিকে আলো জ্বলে যেতে অঞ্জনা ভিজে কাপড়ে তুহিন বাবুকে জড়িয়ে ধরে যে কান্ড এতক্ষণ ধরে করে আসছিল, হুঁশ ফেরামাত্র লজ্জা পেল, তবুও জোর গলায় বলল, ' আমি এখন ও বলছি আমার স্বামী আমার কাছে এসে ধরা দিয়েছিল, তাকে দাদা তুই কোথায় লুকিয়ে রেখে আমার সঙ্গে ছল চাতুরী করছিস, নিজের চোখকে তো কোন মতে আমি কখনও অবিশ্বাস করতে পারি না । ' এই কথা শুনে তার দাদা দৃঢ় কণ্ঠে বলল, 'ভুল করছিস বোন, যেটা তুই দেখেছিস সেটা সেই খানের ঘটনা, যে দৃশ্য আমরা চারজনে মিলে প্রত্যক্ষ করেছি, তারপরে ক্ষণেকের মধ্যে আবার বিদ্যুতের ঝলকানিতে সে বিলীন হয়ে গেল, ও তবে যাওয়ার মুহূর্তে যে অভয় বাণী শুনিয়ে গেছে, সেটা তো নিশ্চয় কানে শুনেছিস, অতএব তোর ললাটে বিধির যে লেখন লেখা রয়েছে তাকে অবনত মস্তকে মেনে নিতেই হবে তোকে, তবে এখন তোর ভাগ্য তুহিনের মা ভগবতী দেবীর অর্থাৎ মাসিমার উপর নির্ভর করছে । তবুও আমার দৃঢ় বিশ্বাস সেই দয়াময়ী মা একজন অবোধ শিশু যে নাকি সদ্য হারা  বাবা, দাদু, ঠাকুরমাকে ও হারিয়ে সম্পূর্ণ অনাথ হয়ে গেছে তার কথা চিন্তা করে তিনি কখনও মুখ ঘুরিয়ে নেবেন না । এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস । '
      এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কিংকিনী দৃপ্তকণ্ঠে বলল, 'আমি আমার মাকে চিনি, সে এখন সম্পূর্ণ আলাদা জগতের মহিলা হয়ে গেছে ; কারণ তার এখন একমাত্র অবলম্বন রাধামাধব, এছাড়া সে সংসারে আর কোন কিছু বোঝে না, অতএব আমার মা খুশী হয়ে এদেরকে সাদরে গ্রহণ করবেই ।'
                                ঠিক সময় মামা দাদু ও দিদা ঘরে প্রবেশ করল, টর্চ হাতে নিয়ে হেমাদ্রির কপালের দিকে আলো ফেলে হেসে হেসে বলল, 'কিরে দাদুভাই, তোর কপালের ঠিক কোণের দিকে কি যেন লাল টিপ লেগে রয়েছে । '
        তখন দিদা বলল, 'তোমার বুড়ো বয়সে কি ভীমরতি ধরেছে । '
                  প্রত্যুত্তরে ললিত বাবু বলল, ' আরে আমি এখন গাঁজা খাইনি, তাই এত ওলট পালট দেখতে পারি না, দেখ দেখ বুড়ি আমার এই টর্চ নিয়ে আমার দাদু ভাইয়ের কপালে আলো ফেলে দেখ, তখন মিনাদেবী টর্চ নিয়ে দেখল সত্যি ঘটনা । তখন দিদা হাসি মনে বলল, 'কী রে দাদুভাই, তোর দাদুকে মিথ্যে মিথ্যে দোষ দিলাম ; কিন্তু আমি তো স্বচক্ষে যেটা দেখলাম, তা তো এক ভীষণ কান্ড । তুই আবার কখন মেয়ে হয়ে উঠলি, এই তো দেখছি আমার সামনে দাঁড়িয়ে একজন জলজ্যান্ত পুরুষ । অতএব এই ঝড় জলের রাতে কি এমন কান্ড ঘটালি যে তোর কপালের কোণে বিবাহিতার লাল টিপ,নিশ্চয় তুই ভাই কিছুকান্ড ঘটিয়ে ফেলেছিস, সেটা আমাদের কাছে বড়ই দুঃসংবাদ, দেখ ভাই, যে বিশ্রী কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছিস,তারজন্য এক্ষুণি মেয়ের গার্জেন পুলিশ নিয়ে ধরতে আসবে না তো ? ' একথা বলেই দাদু ও দিদা দুজনে খিল খিল করে হেসে উঠল ।
                     তখন হেমাদ্রি বলল, ' তোমরা কি যে বলছ, তার কোন বাংলা মানে খুঁজে পাচ্ছি না ।'সঙ্গে সঙ্গে নিজের কপালের চারদিকে হাত দিয়ে ঘসতেই লাল টিপ মেঝেতে পড়ে গেল । তখন নিরুপায় হয়ে দুজন দুজনের দিকে আড়নয়নে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের চোখ নামিয়ে ফেলল, তবে সেটা অবশ্য সবার দৃষ্টির আড়ালে । এবার ঠাট্টা তামাশা বন্ধ করে মামা এসে বলল, 'তোমরা একটু চুপ করবে ? এখন সামনে অনেক কাজ, তাই আর কথা না বাড়িয়ে চল সবাই রাতের খাবার খেয়ে দিয়ে যে যার ঘরে শুতে চলে যাও, কালকে সবাই ভোরে উঠে পড়বে ; কারণ দুপুরের মধ্যে তিনজনের অপঘাত মৃত্যুর শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা করতে হবে,তবে সর্বাগ্রে তুহিনবাবুর মায়ের কাছে খবর দিয়ে সঠিক মন্তব্য নিতে হবে, কি ঠিক বললাম না ভাগনা ? ' সবাই খেয়ে দিয়ে যে যার ঘরে শুতে চলে গেল । কিন্তু যে চারজন বেড়াতে গিয়েছিল, তারা কিন্তু কেউই বিছানায় ঘুমাতে পারল না । বিশেষ করে কিংকিনী কেবল একা একা বিছানায় শুয়ে চটপট করতে লাগল, সে মনে মনে ভাবল সে একজন পূর্ণ যৌবনা যুবতী, উত্তেজনা বশতঃ যে কান্ডটা ঘটিয়ে ফেলেছে তার দায় কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে দেহের মধ্যে পরিবর্তন ফুটে উঠবে, যদি সত্যি কিছু ঘটে যায়, তাহলে সে যে সবার চোখে কলঙ্কিনী হয়ে যাবে । ঠিক সেই সময় বিছানায় মোবাইল বেজে ওঠল । চেয়ে দেখল কে যেন তাকে ফোন করছে । তখন ভয়ে ভয়ে ফোনটা ধরল । ফোনে একজন যুবকের কন্ঠস্বর ভেসে এল  ।    'হ্যালো' আমি হেমাদ্রি বলছি, 'তুমি কোন ভয় পেও না, নিশ্চিত ভাবে জেনে যাও, ওই ঘটনাকে স্বীকৃতি দিয়ে আমি ঘোষণা করলাম, আমরা আজ থেকে হয়ে গেলাম দুজনে স্বামী স্ত্রী, কি ঠিক বললাম না ? তবে আর চিন্তা না করে লক্ষী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে যাও, তাহলে রাখি, এই কথা শোনার পর কিংকিনীর মনে যে চিন্তা ঘনায়ে এসেছিল তা সম্পূর্ণ মন থেকে দূর করে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ল । পরের দিন অর্থ্যাৎ ১৩ ই আগস্ট রবিবার ভোরে সবাই তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল । কিংকিনী বিছানা থেকে ওঠার মুহূর্তে হঠাৎ তার মোবাইলে মায়ের ফোন এল । তখন মায়ের করা দেখে নিজের ফোন তুলল এবং বলল, 'হ্যালো,' বলার সঙ্গে সঙ্গে মা বললেন, 'তোরা কবে নাগাদ আসবি, তবে আসার সময় হেমাদ্রিকে ধরে নিয়ে আসবি, তবে আগ বাড়িয়ে তোকে কিছু বলছি বলে মনে কিছু করবি না, এবার বলছি,তুই এখন পূর্ণ যৌবনা যুবতী, সেদিক থেকে বরাবরের জন্য সাবধান করে দিচ্ছি ; তার কারণ মেয়েদেরকে এই সময় বারবার সাবধান থাকতে হয়, সেটা আর খুলে বললাম না, আমি তোকে ভাল ভাবে জানি ,এখন তুই হয়তো বলবি, দাদাকে ফোন করে আগাম সতর্ক না করে আমাকে কেন সতর্ক করলে ? এই  কথাটা তোর মনের মধ্যে নিশ্চয় এসে গেছে, ছেলের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা, সেই কথাটা তোকে আর খুলে বলার দরকার নেই, তবে সেদিন রাতে হেমাদ্রিকে নিজের কোলে নিয়ে পরিচর্যা করে সারিয়ে তুললি, তবে সেটা খুব সাহসী মনের পরিচয়, তবে গার্ডিয়ান হয়ে তাই সতর্কবাণী দিয়ে রাখলাম, তবে এ -ও বলছি যদি ওকে ক্ষণিকের মধ্যে ভাল বেসে ফেলিস, তাতে আমার কোন অমত নেই, তবে নোংরামো পথে পা বাড়াস না, পদে পদে বিপদ আছে, তাহলে এখন রাখি মা ।'
                              মায়ের অভয়বানী শুনে কিংকিনী মনে মনে মাকে সাধুবাদ জানাল ; কারণ হেমাদ্রির সঙ্গে তার ইতিমধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক  গড়ে ওঠেছে, কিংকিনীকে যে মাসিমা ফোন করেছিল, সে কথাটা হেমাদ্রি জানতই না ।
তাই হেমাদ্রি মাসিমা অর্থাৎ ভগবতীদেবীকে ফোন করল । হেমাদ্রির ফোন পেয়ে ভগবতীদেবী বলল, 'তুমি জন্মাষ্টমী ও স্বাধীনতার দুদিন আমার বাড়ি আসছ তো বাবা ? ' তখন হেমাদ্রি বলল, ' সে তো যাবই, তবে যে কথাটা আপনাকে অবগত করাচ্ছি, সেই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলি আগে শুনুন, বলেই বোনের জীবন এবং বাবার আত্মঘাতী সবই অবগত করল ।' সব কথাগুলি শুনে ভগবতীদেবী কেঁদে কেঁদে বললেন, 'হে দয়াময়, এদের সংসারে একি করলে ঠাকুর ;এই বাচ্চা মেয়েটা তার ছোট বাচ্চাকে নিয়ে কি করে জীবন যাপন করবে, যদি বাবা আমাকে একটু অভয় দাও, তাহলে বলি । '
                                           এই কথা শুনে হেমাদ্রি বলল, ' নিশ্চয়  বলুন, আমি শুনবার জন্য আগ্রহ ভরে বসে আছি । ' তখন ভগবতীদেবী বললেন, 'ওই বাচ্চামেয়েটা এবং অনাথ মেয়ের ভার আমার ওপর ছেড়ে দাও, আমি ওর সারা জীবনের ভার নেব । '
                                তখন হেমাদ্রি উৎসুক মন নিয়ে বলল, ' কি ভাবে নিবেন  ? ' তখন তিনি বললেন, ' আমার ছেলে খোকাকে মত করিয়ে পুত্রবধূ রূপে বরণ করে নেব । '
                         তুহিন হেমাদ্রির কাছ থেকে ফোন নিয়ে মাকে বলল, ' তোমার এই কথা শুনে আমি ও আমার বন্ধু যে আনন্দ পেলাম তা ভাষায় তোমাকে বোঝাতে পারব না, তাহলে এখন আমরা ফোন রাখছি ;  কারণ আজকে অর্থাৎ একটু বাদে অঞ্জনার স্বামী,শাশুড়ী ও হেমাদ্রির বাবার অপঘাতে মৃত্যুর জন্য শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হবে, তাই এখনকার মত আমরা ফোন রাখছি । '
                      তখন মা বললেন, ' ফোনটা রাখিস না, তবে শোন, তোরা সবাই মিলে অর্থাৎ তার বোন, হেমাদ্রি, তার মা, মামা, মামী, তাদের ছেলে, হেমাদ্রির দাদু, দিদিমা সকলে মিলে বিকেলে এখানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে আয়, পরের দিন আমার রাধামাধবের জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠান পালন হবে, ওই দিনই নববধূকে সবার মাঝে আমি বরণ করে নিব, আর শোন,কাল সকালেই তো বড়পিসেমশায় তার সমস্ত পরিবার এবং ছোট পিসেমশায় তার পরিবারের সবাই এসে যাবে, তাহলে আমার অনুরোধ ওনাদেরকে বলে দিবি, ওনারা যেন কোন ভাবে অন্যথা না করেন, এই আশা রেখে ফোন বন্ধ করছি । '
                        ভগবতীদেবীর কথাকে মান্য করে অঞ্জনার ব্যাপারটা মাথায় রেখে ওখানেই বাড়ির সবাই বৌবাজার অর্থাৎ ভগবতীদেবীর বাড়ি আসার সম্মতি দিল । তাই যথারীতি মোহিত, মোহিতের মা এবং হেমাদ্রির বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দুপুরের মধ্যে শেষ হলো । এই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সকলেই তাড়াতাড়ি দুপুরের খাওয়ার খেয়ে আগেভাগে বাড়ির গেটে তালা দিয়ে বিষ্ণুপুর স্টেশনে চলে এল ।
                                        ঠিক ২.০০টায় মেদিনীপুর আদ্রা মেমু প্যাসেঞ্জার বিষ্ণুপুর স্টেশনে এসে দাঁড়াল । সবাই সেই গড়িতে উঠে পড়ল । যথারীতি সেই গাড়ি ৪.১৫মিনিটে মেদিনীপুর স্টেশনে ১ নং প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াল । ওখানে আসামাত্র হেমাদ্রি যথারীতি সবার টিকিট হাওড়া পর্যন্ত কেটে নিল । তারপর সবাই প্লাটফর্ম পেরিয়ে স্টেশনের বাইরে এসে কিছু জলখাবার খেয়ে নিল । কিছুক্ষণের মধ্যে মেদিনীপুর গামী লোকাল ২ নং প্লাটফর্মে প্রবেশ করল । ওরা ব্রীজ পেরিয়ে ওই লোকাল ৬.১০এর গ্যালপিং হয়ে মেদিনীপুর স্টেশন ছেড়ে গেল ।
                           ৬.৪৫ মিনিটে গাড়িটি খড়গপুর জংশনে ৫ নং প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াল । হেমাদ্রি নিজের শীট ছেড়ে প্লাটফর্মের বাইরে এসে একটু ঘোরাঘুরি করল । লোকাল ছাড়ার মুহূর্তে হেমাদ্রি যেই উঠতে গেল, হঠাৎ তার দু চোখের মধ্যে একটি পোকা বিঁধে চলে গেল । শীটে বসে সে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করল  ।লোকালটি চলা অবস্থায় কিংকিনী হেমাদ্রির দু- চোখে অনবরত জলের ঝাপটা দিয়ে ও কোন সুফল লাভ করতে পারল না । এ সময় হেমাদ্রির ডান চোখ দিয়ে একটু রক্ত গড়িয়ে পড়ল, কিংকিনী তখন রুমাল দিয়ে রক্তটা মুছে দিল । গাড়িটা বাগনান স্টেশনে চলে এল । এদিকে হেমাদ্রির চোখের যন্ত্রণা যখন কোন মতে কমছে না, তাই বাধ্য হয়ে কিংকিনী দাদা তুহিনকে বলল, 'জানিস দাদা, চোখ বলে কথা, তুই ওদের নিয়ে চলে যা, আমি ওকে নিয়ে এখানেই কোন নার্সিংহোমে চোখের ডাক্তার দেখিয়ে পরের গাড়িতে ওখানে চলে যাব । '
                                   অন্য সবাই আমতা আমতা করলেও ওদের কথায় কান না দিয়ে অগ্রণী হয়ে কিংকিনী হেমাদ্রিকে নিয়ে ওই স্টেশনে নেমে গেল । স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে কিংকিনী কথা বলে উনার নির্দেশ মত নার্সিং হোমে না গিয়ে বাগনান রুরাল হাসপাতালে হেমাদ্রিকে নিয়ে গেল, ওখানের হাসপাতাল সুপারের সঙ্গে কথা বলে সঙ্গে সঙ্গে চক্ষু বিভাগে হেমাদ্রিকে ভর্তি করে দিল এবং সুপারের বিশেষ কেয়ারে চক্ষু বিভাগের একজন সিনিয়ার চক্ষু সার্জেনকে বিশেষ কল করে রোগীকে বিশেষ যত্ন নিয়ে দেখতে বললেন ।
     চক্ষু বিভাগের সার্জেন এসেই ভারপ্রাপ্ত ওয়ার্ডের নার্সকে সঙ্গে সঙ্গে একটি ইনজেকশন দিতে বললেন, যাতে রোগীর চোখ দুটিতে  ইনফেকশন আর না ঘটে এবং খানিকক্ষণ বাদে আর একটি ইনজেকশন ডাক্তারবাবু নিজে রোগীকে দিলেন পরে বাড়ির লোক অর্থাৎ কিংকিনীকে বাইরে থেকে একটা দামী ট্যাবলেট আনতে বললেন । আনার পর নার্সকে দিয়ে খাওয়াতে বলে গেলেন এবং যাওয়ার সময় নার্সকে বলে গেলেন, 'আপনি ঔষধ টা সময় মেনে খাওয়া বেন, কিছুক্ষণ বাদে তিনি মোটামুটি অপারেশন করার মত দরকারী যন্ত্রপাতিগুলি যেন হাতের কাছে পান ।' এই বলে তিনি অন্য
 ওয়ার্ডে ভিজিটে গেলেন ।
                    ডাক্তারবাবু চলে যাওয়ার পর নার্সকে কিংকিনী সাহস করে জিজ্ঞাসা করলেন, 'চোখ দুটির অবস্থা এখন আপনার কেমন মনে হয় । 'প্রত্যুত্তরে নার্স বললেন, 'আমি তেমন কিছু না জানলেও আমার মনে হয় রোগীর ডান চক্ষু থেকে রক্ত বের হয়েছে, তার জন্য তিনি বিশেষ প্রটেকশন নেওয়ার জন্য এই কথা বলেছেন । ' তখন রাত ৯.৩০ মিনিট । এদিকে তুহিন কিংকিনীকে  ফোনে বলল, ' আমরা সবাই এইমাত্র ঘরে এলাম, এসেই তোকে ফোন করলাম, হ্যাঁরে , হেমাদ্রি এখন কেমন আছে রে ?'
                         তখন কিংকিনী বলল, ' যন্ত্রণা টা একেবারেই নেই, তবে ডাক্তারবাবুর কাছ থেকে যতক্ষণ না ভাল সংবাদ না জানতে পারছি, ততক্ষণ কোন কিছুই সাহস করে বলা যাবে না, তাহলে রাখছি । '
                           এবার কিংকিনী ভাবল এটা তো একটা হাসপাতাল তাই কোন মতে পুরুষ বিভাগে থাকতে দিবেই না । অতএব সেই চিন্তা করে তৎক্ষণাৎ হেমাদ্রিকে বলে গেল, ' আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, নিমেষেই চলে আসব । ' এই কথা বলে সে হাসপাতালের চত্বর থেকে একটু দূরে চলে এল । সে যা মনে ভাবল তাই করে ফেলল । সে একটা মনোহারী দোকান থেকে একটা সিঁদুর কৌটা কিনে ফেলল, তারপরে সে একটু আলোর বাইরে গিয়ে তার ব্যাগ থেকে আয়না বের করে খুব ছোট্ট করে সিঁথিতে একটু সিঁদুর লাগিয়ে ব্যাগ থেকে একটা লালটিপ বের করে কপালে পরে নিয়ে সোজা হেমাদ্রির কাছে  হলে এল ।
                                রাত্রি ৯.৩০ মিনিট বাজার সঙ্গে সঙ্গে সেই ডাক্তারবাবু এসে নার্সকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখন এই রোগীর কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা ?'প্রত্যুত্তরে নার্স বললেন, 'সেই ট্যাবলেট খাওয়ানোর পর কোন উপসর্গ দেখা দেয়নি । ' ডাক্তারবাবু বাড়ির কোন লোক আছে কিনা জানলেন ।
                                  আগ বাড়িয়ে কিংকিনী ডাক্তারবাবুকে বললেন, ' আমি ওঁর স্ত্রী, আমার আর সঙ্গে নেই, অতএব দয়া করে এই রাতটা যাতে রোগীর কাছে থাকতে সম্মতি দেন, তার জন্য অনুরোধ রাখছি, আমি জানি এটা পুরুষ বিভাগ, তাই কোন মতে মহিলাকে বিশেষ করে একজন যুবতীকে অনুমতি দেওয়া গর্হিত অপরাধ । ' ডাক্তারবাবু ভাবলেন একজন বিপদ গ্রস্তা যুবতীকে বাইরে বের করে দেওয়া সেও চরম অপরাধ । তাই অনেক চিন্তা করে তিনি নার্সকে বললেন, ' আমি এক্ষুণি রোগীর ডান চোখটা তুলো দিয়ে গজ কাপড় বেঁধে দেব, তারপর যে যে ঔষধগুলো লিখে দিব, সেই সব  ঔষধগুলো কিছু পাওয়া গেলেও বিশেষ কয়েকটা দামী ঔষধ বাইরে থেকে এনে দিতে বলবেন, তবে রোগীর ভাগ্যজোরটা খুব ভাল, তাই যে সব ঔষধ লিখে দেব, সে গুলি খেলেই মনে হয় সাময়িক ভাল হয়ে যাবে । 'ডাক্তারবাবু এবার তাঁর স্ত্রীর উদ্দ্যেশ্যে বললেন, ' শুনেছি আপনাদের বাড়ি কলকাতায়, তাই বলছি ওনার ডান চোখের ব্যান্ডেজ খোলার পর অর্থাৎ ঔষধ গুলি শেষ হলেই আর একবার ভালো করে পি.জি. হাসপাতালে খুব ভালো চোখের সার্জেনকে দেখিয়ে নিবেন ; কারণ ডান চোখটা হয়তো চিরদিনের মত নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তাই ঔষধ খাওয়ার শেষে যদি এই চোখটা দিয়ে উনি ঝাপসা  দেখেন, তাহলে একেবারেই দেরী না করে ওই হাসপাতালে ডাক্তার বাবুর পরামর্শ মতো ব্যবস্থা নেবেন, হয়তো খুব তাড়াতাড়ি চোখটা অপারেশন করতে হবে, এই সতর্কবাণী দিয়ে গেলাম । '
      পরে ডাক্তারবাবু নার্সকে বললেন,  'আমার কাজ শেষ হলে পর ওনাকে এই রাতের মত একেই বেড়ে  থাকবার জন্য অনুমতি দিবেন । 'এদিকে ডাক্তারবাবু নার্সকে নিয়ে প্ৰায় আধ ঘন্টার মধ্যে সব কাজ সমাধা করে ফেললেন এবং হাসপাতালের ব্যবস্থা পত্রে ঔষধ গুলি সব লিখে দিলেন, যে গুলো এই হাসপাতাল থেকে পাওয়া যাবে, সেগুলোতে দাগ না দিয়ে যেগুলো বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে সেগুলো দাগ দিয়ে কিভাবে খাওয়ানো হবে, সব নির্দেশ দিয়ে দিলেন এবং রোগীর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন, ' আজ সকালে ভিজিটে আসার পর রোগীর সব কিছু দেখে  নেওয়ার পর তবে ছুটি মঞ্জুর করব, তার আগে রোগীকে নিয়ে বাড়ি চলে যাবেন না । '
                                    এই  কথা বলে ডাক্তার বাবু ওয়ার্ডের বাইরে চলে গেলেন ।
                               আর এদিকে রোগীদের রাতের খাবারের গাড়ি ওয়ার্ডে প্রবেশ করল ।সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ড মাস্টার এসে বললেন,    ' 'রোগীর খাওয়ার পর রোগী ছাড়া অন্য কেউ থাকবেন না । ' এই কথা তাঁর শেষ হতেই দায়িত্ব প্রাপ্ত নার্স উনাকে বললেন, ' এই রোগীর স্ত্রীকে এই রাতে থাকার জন্য বিশেষ অনুমতি ডাক্তারবাবু দিয়ে গিয়েছেন ; কারণ ওনার বাড়ির অন্য কেউ নেই, সেই কথা ভাবা তিনি বিশেষ অনুমতি দিয়ে গেছেন । ' ওয়ার্ড মাস্টার আর ওনার থাকার ব্যাপারে কোন কথা না বলে বাইরে চলে গেলেন ।
                              রোগীর খাওয়ার একমাত্র রোগীদের জন্য, অন্য কারো জন্য নয়, তাই কিংকিনী হেমাদ্রিকে খেতে দিলেন । তখন হেমাদ্রি বলল,  'তুমি এখন কি খাবে  ? '
                                      তখন কিংকিনী বলল, ' আমি যখন বাইরে ঔষধ কিনতে যাব, তখন সেইখানে কিছু খেয়ে নেব, আমার জন্য কিছু চিন্তা করতে হবে  না তোমাকে ।' হেমাদ্রির খাওয়া শেষ হওয়ার পর কিংকিনী কথামত আগে সব দরকারী ঔষধ গুলি কিনে সামান্য জল খাওয়ার খেয়ে অতি সত্বর সেখানে চলে এল ।
                   তবে প্রবেশ করার সময় নৈশ প্রহরীর বাধা পেলে ও বিশেষ অনুমতি পত্র দেখানোর পর তাকে প্রবেশ করার জন্য তেমন বেগ পেতে হলো না । সে হেমাদ্রির কাছে আসা মাত্র অন্য একজন নার্স  তাঁকে বললেন,  'আপনার থাকার অনুমতি পত্র আছে তো  ? '  তখন কিংকিনী উত্তর না দিয়ে অনুমতি পত্র দেখিয়ে দিল, তখন নার্স বললেন, ' আপনি যখন রাতে থাকছেনই, অতএব রোগী রাতে আধঘন্টা অন্তর মোট চারটি ট্যাবলেট ভোর ৬.৩০ মিনিট পর্যন্ত খাবেন, তবে আমি তো থাকবই, তবুও আপনাকে একটু সজাগ করে দিলাম । যদি কারও ঘুম ধরে যায়, ' এই কথা বলে তিনি একগাল হাসি হাসলেন । রাত যখন ক্রমশঃ গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল তখন সব রোগী ঘুমে অচৈতন্য একমাত্র দায়িত্ব প্রাপ্ত নার্স এবং কিংকিনী প্রায় জেগেই থাকল  ।  আর এদিকে হেমাদ্রির পাশে থাকা অর্ধাঙ্গিনীকে  বলল, ' তুমি বোধ হয় কিছু খাওনি ।'  তখন কিংকিনী প্রত্যুত্তরে বলল, 'জান না বুঝি, রোগীর পাশে থাকলে তাকে অল্পই খেতে হয় ; কারণ ভারী খাওয়ার খেলে ঘুম এসে যাবে, রোগীর কথা মাথায় রেখে একটু হালকা টিফিন খেতে হয় । 'প্রত্যুত্তরে হেমাদ্রি বলল,  ' তুমি আমাকে এত ভালবাসো বুঝি  ? তা না হলে এ -রকম অভিনয় করে এক রাতের স্ত্রী সেজে নিলে, তারপর টাকা দিয়ে সব ঔষধ কিনে আনলে, সর্বোপরি এক বিছানায় সর্বসমক্ষে শুয়ে পড়লে । '

বেদান্তের লক ডাউন পর্বে লিখছেন শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার

অর্ধনারীশ্বর
***********
- শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার


গোলাঘরের সামনে একটা মস্ত কাঁঠালগাছ। গাছটার বয়স হয়েছে। এ বাড়ির কর্তার একসময়ে ইচ্ছা হয়েছিল আম কাঁঠালের বাগান করবেন, করেওছিলেন।  এখন সব যেতে যেতে বসত ভিটা, দোলমঞ্চ আর কাঁঠালতলাটাই রয়ে গেছে। 

দুই শরিকের সম্পত্তি। দুপক্ষই এখন নিছক মধ‍্যবিত্ত। অবস্থা পড়তির দিকে। দুটো বড়ো গোলা আর একচিলতে উঠোনটা তাও আছে। যার যা ভাগে পড়েছে তা আগেই বেচে দিয়ে শহরে চলে গেছে। এত হাতবদলেও  রয়ে গেছে সেই দোলমঞ্চ আর বসতভিটেটুকুই। 

আমরা ছেলেবেলায় দোলের আগে দেশের বাড়ি যেতাম। দোলমঞ্চটা ওই কদিন সেজে উঠত আর কীর্তনের বোলে নেচে উঠত। ননীগায়েনের বায়না হত অষ্টপ্রহর সংকীর্তনের। গ্রামশুদ্ধ লোক অাসত তা শুনতে।

 ও তরফের শুধু এক জ‍্যাঠামশায় ছিলেন। খুব বুড়ো নন, তবু বাবা বড়দা বলতেন। তিনি  কখনও চাকরিবাকরী করেননি। দেশে থেকে জায়গাজমি দেখতেন। এমনিতে শান্ত নিরীহ হলে কি হবে ওনার মাথার গোলমাল বাধত হঠাৎ করেই। চৈত্র বৈশাখে শুনেছি ওপরের দোতলার ঘরে তালা দিয়ে রাখতে হত। মুনিশ ছিল একজন। সেই কেবল সামনে ঘেঁষত তখন, চান খাওয়াও করিয়ে দিতে হত তখন।

মাথার ব‍্যামো বাড়লে সামনে কেউ এলে লাঠি হাতে তাড়া করতেন। বলাবাহুল‍্য কাপড়চোপড় ঠিক থাকতনা তখন। বাড়ির বৌ-ঝি'রা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সরে যেত আর আড়ালে কি সব বলাবলি করত। মনে আছে উনি ওই কাঁঠালতলাটায় লাঠি হাতে চুপ করে কখনো বসে থাকতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। কি উদাস নির্বিকল্প দৃষ্টি তাঁর তখন। ঠিক একটা  মূর্তির মত মনে হত তখন তাঁকে। 

শুনতে পেতাম ওঁর স্ত্রী নাকি ওই কাঁঠালগাছে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত‍্যা করেন। সেকালে পুলিশের অত ঝামেলা ছিলনা। অত বড় বংশের ব‍্যাপার, গ্রামের মাতব্বরেরাই থানা পুলিশ সব  সামলে দিয়েছিল। আর তারপর থেকেই মাথার অসুখটা বাড়ে। সবাই বলত জ‍্যেঠিমা মারা যাবার পর জ‍্যেঠামশাই জ‍্যেঠিমার কাপড়চোপড় পড়ে এমনকি কপালে সিঁদূর ধেবড়ে বসে থাকতেন একটা অর্ধনারীশ্বর সেজে। ওনার টকটকে ফরসা থলথলে গা'য় সেই অদম‍্য নারীবেশে লোকের ভয় করতো। জ‍্যাঠামশায় কিন্তু নির্বিকার হয়ে থাকতেন। রাতের বেলা মুনিশ ওর ঘরে শুতো, লোকে তাই নিয়েও দু'কথা  বানাতে ছাড়তো না। জ‍্যেঠামশায়ের পুরুষত্বহীনতাই নাকি জ‍্যেঠিমার আত্মহননের কারণ বলত সবাই। 

আমরা তখন বোধহয় তেরো কি  চোদ্দ হব। দোলের সময় দেশে গেছি, আমাদের বন্ধু হরিশ কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ ছুটে এল। ওকে নাকি বিস্কুটের লোভ দেখিয়ে জ‍্যেঠামশায় নিজের ঘরে ডেকে জোর করে ওর হাফপ‍্যান্টটা খুলে.....
এ খবর রটতেই অনন্তকাকা মানে হরিশের বাবা পাড়ার লোকজন ডেকে জ‍্যেঠামশায়কে বেধড়ক মার মারলো। আশ্চর্য, উনি অত বড় বংশের ছেলে, পাগল হলেও মানী লোক, তাও তাকে কেউ বাঁচাতে এলনা। একটা লালপেড়ে শাড়ি কোনওমতে জড়িয়ে আদুল গায়ে বসেছিলেন। প্রায় স্খলিতবসনেই চুপ করে মার খেতে লাগলেন বিনা প্রতিবাদে। শেষে বাবাদের হস্তক্ষেপে ওপরের ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হল। আমাদের স্বাভাবিকভাবেই যত্রতত্র বেড়ানোয় বাধা পড়লো। 

সেবার দোলের আড়ম্বরে একটু বিঘ্ন ঘটল। দুপুরে ভোগের থালা ওঁর ঘরে দিতে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো মুনিশ। নিজের বন্ধ ঘরে জ‍্যেঠিমার সমস্ত গয়না গায়ে পরে,সারা দেহে আবির মেখে , চোখে ধ‍্যাবড়া কাজল আর টকটকে লাল সিঁদূরের টিপ পড়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ জ‍্যেঠামশায় একটা গরদের কাপড় দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে কড়িকাঠ থেকে নিষ্প্রাণ হয়ে  ঝুলে আছেন। ওহ্! কি বীভৎস সেই দৃশ‍্য। 

গলায় ফাঁস লেখে প্রাণবায়ু বেড়িয়ে যাবার সময় মল ও মূত্রের সাথে সামান‍্য আঠালো বীর্যরস বেরিয়ে জ‍্যেঠামশায়ের পুরুষাঙ্গটিকে আজীবনের ব‍্যর্থতার অপমান থেকে চিরকালের মত মুক্ত করে দিয়ে গেছে ।
*************************

বেদান্তের লক ডাউন পর্বে লিখছেন সুদীপ্ত বিশ্বাস

বুদ্ধিজীবী


বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিজীবী, তোমার বিবেক আছে?
আমজনতা মরলে পরে মন পোড়ে তার আঁচে?
বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিজীবী, বিক্রি হয়ে গেছ?
কত টাকা কেজি দরে শিরদাঁড়াটি বেচ?
তোমার যত গান-কবিতা, তোমার যত ছবি
সব কিছু তার মিথ্যে তবু তোমায় ভাবি কবি।
বুদ্ধিজীবী শাসক দলের ইশারাতে নাচো,
মনের সুখে গুছিয়ে আখের বেশ তো তুমি আছো।
মুখোশধারী বুদ্ধিজীবীর চামড়া খুবই পুরু,
আমরা তবু বুদ্ধু কত, তাদের ভাবি গুরু।
তাইতো বলি ভাই বোনেরা একটি শপথ নিও
বুদ্ধিজীবী দেখতে পেলেই মুখখানা ভেংচিও।

বেদান্তের লক ডাউন পর্বে লিখছেন চঞ্চল রায়

★ স্বাধীনতার গান ★
                      চঞ্চল রায়



স্বাধীনতাকে জানতে হলে
পড়তে হবে ইতিহাস, 
না পড়লে জানবে কি করে
যেথায় করি বাস। 
কেমন করে এলো স্বাধীনতা 
কেমনে হলো দেশ ? 
জানা সবার খুবই প্রয়োজন 
না হলে হবো শেষ। 
বাংলায় জন্ম আমার-তোমার 
সবাই থাকবো এক,
জন্মদিন পালন করতে
খুশিতে কাটি কেক।
জীবনদিয়ে পেয়েছি স্বাধীনতা 
রাখবো ধরে মান,
হারিয়ে যেতে দেবেনা আমরা
গাইব স্বাধীনতার গান।
ভালো টাকে করব গ্রহণ 
খারাপ টাকে করব বর্জন,
জীবন দিয়ে করব রক্ষা 
স্বাধীনতার যত অর্জন। 
........................................................
(২)
★ প্রবাস জীবন ★
                      চঞ্চল রায়
সবার মুখে হাসি ফোটাতে
বিদেশ ছুটে যাই,
একটুখানি সুখের আশায়
কত যন্ত্রণা পাই।
প্রবাস মানে অন্য জীবন
অন্য দেশে থাকা,
প্রবাস মানে কত প্রশ্ন
সুখে-দুঃখে মাখা।
প্রবাস মানে স্বপ্ন দেখা
কত আকাঙ্ক্ষা মনে,
প্রবাস মানে অন্য দেশে
যাচ্ছে জনে জনে। 
প্রবাস মানে কঠোর শ্রম
কঠিন জীবন যাপন,
কষ্ট করে ঘাম ঝড়ালেও
হয়না কেউরে আপন।
সুখের আশায় যাচ্ছি বিদেশ
কত স্বপ্ন তাতে,
সাগর মাঝে যাচ্ছে জীবন
দালাল দেরোই হাতে।
......................................................
(৩)
★ বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ★
(ব্র্যাক প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদ স্মরণে)    
                          - চঞ্চল রায়    
মানবতার সেবায় নিবেদিত
ছোট ছোট পদক্ষেপ
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বপ্নদ্রষ্টা
ফজলে হাসান আবেদ। 
অনৈতিক স্বনির্ভরতার খোলসে
নীরব নারীমুক্তির আন্দোলন
স্বনির্ভর করার দৃঢ়প্রত্যয়ে
করেছিলেন তিনি পন। 
প্রথমে কাজ করেন পুনরবাসন 
পরে কমান শিশু মাতৃমৃত্যুর হার
স্কুলেযেতে মেয়েদের সাইকেল দেন
নারীরা দারিদ্র্য থেকে হয় পার।    
বিশ্বব্যপী রাজনৈতিক সমথর্ন আদায়ে
অ্যাকশন বাংলাদেশ এর অবদান
স্বাধীনতার স্বপক্ষে জনমত তৈরিতে
তিনি কাজ করে যান। 
হেলপ বাংলাদেশ এর মাধ্যমে তিনি 
অর্থ সংগ্রহের কাজ করেন 
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে
প্রচারপত্র বিজ্ঞাপনও প্রকাশ করেন।   
ভালো কাজের মধ্যে দিয়ে যারা
অনেকেই হয়েছেন বরণীয়
ব্র্যাক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনিও
হয়ে থাকলেন চির স্মরণীয়।         ...........................................................
(৪)
 ★ নতুন ক্যালেন্ডার ★
                         চঞ্চল রায়    
চলমান গতিতে তোমাকেও
ফিরে আসতে হয় প্রকৃতির নিয়মে
তাই তোমাকে জানাই স্বাগতম। 

কিন্তু মানব জীবনের প্রকৃতিতে     
যা ঘটে চলছে তা আর ফিরবার নয়
তাই ছোট জীবনে পাওয়া তাতে কিসেকম। 
তোমার চক্রাকারে ঘুর্নায়মান স্বভাব
আমাদের পালন করতে হয়
তাতে তোমার কিছু যায় আসে না। 

তুমি শুধু প্রেসক্রিপশন করে দিয়ে যাও
হাসি কান্নার আলো আঁধারের বুকে
আর তো তাই ফিরে আস না। 

তোমারও অবশ্য দোষ দিয়ে লাভ কি 
তোমাকেও তো দয়া মায়া ছেড়ে
চলে যেতে হয় নতুনের পথ ধরে ।        

হয়তো তাই পুরনো কাপরের মত
ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয় তোমাকেও
নতুন বছরের নতুন ক্যালেন্ডারে।   
........................................................... 
(৫) 
★তোমাদের এই নগরে ★
                          - চঞ্চল রায়  
   
তোমাদেরএই নগরে   
কতগাড়ি ঘোড়া চলে,
চলুক আপত্তি নেই
কিন্তু যার যা ইচ্ছে মতো
চালানো সেখানেই প্রশ্ন? 
লাইন থেকে বেলাইনে 
গাড়ী চালনোর প্রশিক্ষণ,
তোমাদের কে দিয়েছে? 
তাও জানা নেই! 
তাই তোমাদের গাড়িতে 
উঠতে বসতেও ভয় লাগে,
কখন যে কোথায় লাগাবে
তার কোন শেষ নেই।   
যেখানে ধীরে চলাচলের নিয়ম
সেখানে তোমরা জোরে চালাও,
আবার যেখানে হর্ণ বাজানো নিষেধ
সেখানে আরও বেশি জোরেে হর্ণ দাও। 
কেন বাফু, হর্ণ বাজাতে বুঝি ভালো লাগে? 
আজকাল আবার পায়ে ঠেলা গাড়িতেও
দেখছি মোটর ইঞ্জিন লাগিয়েছো
বাহ্ দারুণ! এত বুদ্ধিমান তোমরা।
এত বুদ্ধি নিয়ে কিভাবে ঘুমাও
তাও জানা নেই । 
শুধু শুনতে পাই প্রতিদিন তোমরা মর
আর তোমাদের আপন জনদেরকে
সারাজীবন দুঃখে-কষ্টে কাঁদাও। 
তোমরা তো নিজে মরই
তাতে আমার দুঃখ লাগে না,
কিন্তু তোমাদের গাড়িতে যাদের মৃত্যু হলো
তাদের জন্য বড়ই দুঃখ হয়। 
তারা না জেনে তোমার ড্রাইভিংলাইসেন্স হীন
গাড়িতে উঠে তাদের  মৃত্যু  হলো,
আর এসব দেখাশুনা  যাদের দ্বায়িত্ব
তারা কতটুকু দায়িত্বশীল তাতেও অনেক প্রশ্ন?  
.............................................................................

(৬)
★ শুধু তোমার মনে নেই ★
                              চঞ্চল রায় 
এই আলো বাতাস সবাই জানে
এই সবুজ বন বৃক্ষ লতা ফুল ফল, 
ঐ যে দূর দিগন্তে নীল আকাশটাও 
মনে রাখে, শুধু তোমার মনে নেই।
রাস্তার সেই  ফুলের গাছটাও জানে
তোমার আমার চিরন্তন প্রেমের কথা
কত বকুল ফুল দিয়েছিল তোমাকে 
আর তুমি মালা গেঁথে দিতে আমায়। 
নদীর ধারে বট গাছটি এখনো আছে 
পাতারা নিরব শব্দে আমাদের কথা কয়,
আমাদের প্রেমের কথাগুলো ভাসছে 
দিন-রাত্রি জানে শুধু তোমার মনে নেই। 
ঐযে সাগরের বাঁধ ভাঙ্গা দূরন্ত জোয়ার 
বালিতে লেখা তোমার নাম ঢেঁউ জানে
পাখিরাও চুপিচুপি ডালে বসে দেখেছিল
আমাদের চুমুর সেই মিষ্ট গোপন দৃশ্য ।
ঐযে পাহাড়ে পাথরের গায়ে লেখা নাম
এখন আরো অনেক উজ্জ্বল হয়ে আছে,  
ঐ পাহাড়ের ঝর্ণার শব্দও জানিয়ে দেয়
তাদের মনে আছে শুধু তোমার মনে নেই।
......................................................................................(৭)
★ পাহাড়ের গায়ে পাহাড় ★
                           চঞ্চল রায় 
পাহাড়ের গায়ে পাহাড় 
পাহাড় ডিঙিয়ে যায়,
কত অজস্র গাছপালা 
চোখ দেখতে পায়।
শতশত পশু-পাখি
মনের সুখে উড়ে,
তাই দেখে চোখগুলো
যায় যেন জুড়ে । 
পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে 
তিস্তা বয়ে গেছে, 
পাহাড়ের ধৈর্য দেখে 
অনেক শেখার আছে। 
কত রাস্তা বয়ে গেছে 
পাহাড়েরও গায়, 
আঁকাবাকঁ ছোট পথ
মনে ভয় পায়। 
মেঘেরা যেমন ভাবে
পাহাড় ঘেসে  উড়ে,
তুমি বিনে ভালোনেই 
থেকো নাকো দূরে। 
..............................................

(৮)
* কবিতার মধ্যেই আমাকে পাবে *
                                    চঞ্চল রায় 
আমি চলে গেলে তোমরা কেঁদো না
তোমরা আমার কবিতা পড়িবে,
কবিতার মধ্যেই আমি থাকবো
কবিতার মধ্যেই আমাকে পাবে।

আমি জানি মানুষ মারা গেল 
প্রতিদিন কেউ কাঁদতে পারেনা,
সে আপনজন হোক বা না হোক 
কিন্তু কবিতা প্রতিদিন পড়া যায়। 

মনের সব ব্যথা-ব্যদনা দূর করে
যখন কোন কিছু ভালো লাগবে না
তখন হয় কবিতা পরিও অথবা লিখিও
দেখবে মনের সব অশান্তি চলে গেছে ।

সময়ের ব্যবধানে কতকিছুই নশ্বর হয়
একসময় রাজা-বাদসাদের প্রভাব ছিল 
আজ তারা নেই শুধু পরে আছে স্মৃতি 
প্রকৃতির নিয়মেই সবাইকে যেতে হয় ।
...................................................................................
.
(৯)
★ সন্তোষেই সন্তুষ্টি ★
                        - চঞ্চল রায় 
পৃথিবীতে অনেক কিছুই চাওয়ার থাকে
হয়তো পাওয়া হয়ে উঠে না,
কেন হয়ে উঠে না.... 
সেই অভিজ্ঞতা অনেকেরই  আছে । 
তাই সন্তোষেই সন্তুষ্ট মেলে
কিন্তু মন কেন তা বুঝে না, 
আত্মার চাওয়াটা কতটা জটিল 
তা নিরবে ভাবুন বুঝতে পারবে ।
অাসলে ষড়ঋৃপুকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন 
অাত্মা শুধু চায় আর চায়....
আবার অনেকের চায়ও না
প্রাকৃতিক জগতে জড় যতসব চাওয়া । 
কিছুক্ষণের জন্য তষ্ট হলেও... 
পরক্ষণেই আবার অতৃপ্তি  জাগে মনে
পুনরায় চাওয়ার আকাঙ্খা আসে
যাহা সান্তনাতেই তৃপ্ত হওয়া সম্ভব। 
*********************************

(১০)
★আমরা যদি সজাগ থাকি ★
                            চঞ্চল রায়
ছেলেধরা গুজব চলছে ! 
দেবোনা কেউ কান, 
না-জেনে কেউ পিটাবো না 
নেবোনা কারো প্রাণ। 
ভুয়া কথায় কান দেওয়া
নিজের সময় নষ্ট, 
পরের কথায় করলে কাজ
হবে পরে কষ্ট। 
সেতু নির্মাণে মাথা লাগে 
মিথ্যে খবর ভাই, 
এই কুসংস্কার দূর হোক 
সবাই মোরা চাই।
মাদক নেশা ছেয়ে গেছে 
যুব সমাজের মাঝে, 
ভুল পথে কেউ যাবো না 
সকাল-সন্ধ্যা-সাঁঝে। 
শিশু ধর্ষণ হবে কেন? 
যৌন হয়রানিও ঘটে, 
আমরা যদি সজাগ থাকি
দমন হবে বটে। 



বেদান্তের লক ডাউন পর্বে লিখছেন বৃন্দাবন ঘোষ

বলবোই

বৃন্দাবন ঘোষ



কেমন যেন করে হাহাকার ভিতরটা আমার, 
তোমার লাগি বুঝাই কি হয় ভাষা ভালো নেই আর। 
কতদিন তো হয়ে গেল নতুন তুমি তেমনি। 
তোমায় পাবার বাসনা সে যায় কি এমনি এমনি? 
বাসনা যেতে চাই না দিতে ধরে রাখতে চাই, 
ধরে রাখার মধ্যে অপার অসীম আনন্দ পাই। 
থাকতে কে চায় নিরানন্দে তেমন কজন আছে, 
শত জনের এক জনেরও খবর তো নেই কাছে। 
তোমায় রাখব আপন করে এখনো বলি জোরে, 
থাকবে তুমি আমার হয়ে বিচ্ছেদ কে করে। 
শতবাধার মাঝেও তুমি হবেই আমার, 
এই ক্ষেত্রে হবে না জেনো নড়চড় 
কথার। 
তোমায় পেলে অমৃত টাও যেন আলুনি লাগে, 
তুমি জন্ম জন্মের সাথী তা বলবোই  আগে।