Thursday, April 30, 2020

বেদান্তের লকডাউন পর্বে অনিন্দ্য কাঞ্জীর কবিতা

নিঃশ্বাসের বিশ্বাসে
অনিন্দ্য কাঞ্জী
************
শিখিনু জনম হতে শুধুই অর্পিতে
গৃহীতের নাহি অধিকার,
ঘরেতে বাহিরিতে সকল করমেতে
অভ্যাসে ধরি অঙ্গীকার।

জীবন সরণীতে চলিতে চলিতে
যদিবা কভু কিছু আগে,
প্রেমের সুবাসে মম মনের হরষে
গোধূলীর রঙ আসি লাগে।
এহেন মাদকতা বুঝিনে গতে তা
অধরাই ছিল অনুভবে,
পাগল পরাণ মোর হইল হয়রান
অন্তরের নিঃশব্দ রবে।

আরম্ভ করিতে না করিনু আড়ম্বর
অবিরাম জানি বাহিতে,
অন্ত অনিশ্চিত তবু জ্ঞাত নিশ্চিত
প্রেম রইবে নিষ্কলঙ্কিতে।
যতদিন রবে শ্বাস দিনু এ আশ্বাস
কদর করিবো ভালোবাসার,
রহিলে হব খুশি বিদায়ে নারে দুষি
আত্মার তৃপ্তি তা স্মরিবার।

হিদয়ের গভীরে প্রণয় যে বহিবারে
না হইবে মরণেও অবসান,
মানসী তুমি মম ভাবনে শাশ্বত সম
মহীয়সী তুমি যেগো প্রাণ।

বেদান্তের লকডাউন পর্বে সুপর্ণা ভৌমিকের কবিতা

চাওয়া
সুপর্ণা ভৌমিক
************
বিরহ, কষ্ট, কান্না, বেদনা
একরাশ যন্ত্রণা /
হয়ে গেছে রক্তিম অস্তিত্ব
কেমনে জানি না //
খোঁজেনি প্রিয়জন/
আমার এই মন/
দেয় নি ডুব মন সাগরে/
পাই নি তারে হৃদয় গভীরে //
আমিও হয়েছি তাই
রহস্যে মোড়া একজন /
মায়াবী কোমলতার 'পরে
কঠোরতার আস্তরন//
বন্ধ করেছি মনের
সকল জানালা/
যদি সাধ্য থাকে, খুলুক
বন্ধ মনের তালা//
তবেই করবো তারে
নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ /
সাজিয়েছি নৈবেদ্য
জানিয়ে প্রাণের আমন্ত্রণ //
যেমনই হও তোমারেই
করবো বরণ/
তুচ্ছ করতে পারি
আমার মরণ //
এসো মোর প্রেয়স প্রিয়
অপেক্ষায় এই মন /
এ প্রেম আর কারও তরে নয়
শুধু তোমা লাগি আয়োজন //

বেদান্তের লকডাউন পর্বে লিখছেন আদিত্য বর্মন

.... মহামারী....

ভীত মহামারী থেমে গেলে
দেখা হবে আবার।
বই পড়ায় , কফি কাপ এ 
কিংবা সাক্ষী হব মায়ের ঘাটে সূর্য ডোবার।।

তবু দেখা হবে আমাদের,
হাটবো তোমার সাথে আরো একশ বছর ।
স্প্যানিশ ফ্লু থেকে
কভিড 19 ।
কিংবা তার ও পরে ।

জনমানবহীন পৃথিবীতে
ছাপরেখে যাবো আমাদের।
তোমার গলার নিচে
কিংবা কানের ভেতরে। মস্তিষ্কে কিম্বা পাবে ঠোঁটে
আমার উষ্ণ নিঃশ্বাস।

হয়তো বাস্তবে তোমার কন্ঠলগ্ন হবো,
না হয় স্বপ্নে পরাবো বেনারসি। 
তোমার গলার স্বর বেরোবে না জনসমাজে
মন বলবে আজও ভালোবাসি

বেদান্ত লকডাউন পর্বে অভিজিৎ দাসকর্মকারের কবিতা

সাক্ষরতা লাভের ক্লাসে 
অভিজিৎ দাসকর্মকার 

১টি কম্পাস রবীন্দ্র স্ট্যাচুর মোড়ে সাইরেন টানছে, ফুসফুসে বড়রাস্তা মোড়ের পৌর আলো নিরর্থক ক্ষমাপ্রার্থী___

জ্ঞানশূন্যের ঈশাণ কোণে পর্দা নগরীতে ঢুকছে যাত্রীসাধারণের প্রস্তাবনা ভর্তি ডাউন লোকাল ।  

বালকবেলার রোলকল এখন শব্দবৃক্ষের অ্যাপ্রোচ করে।  

ঠোঁটে ফেব্রুয়ারি রঙের পিনকোড। 

বিবর্ণ মনের পরাগমিলিত ফুলটি সূচকের নামে গন্ধ ছড়াচ্ছে,  গা-ময় পচন আর হস্তাক্ষরে নতুন ইস্তেহার। 

রাতগুলোর নক্সী সেলাই টহল দিচ্ছে বইকাল দৃশ্যে। 
ও তুমিই তাহলে,  

রাশিচক্রে ষাড়ের চরিত্রটির ক্ষেত্রফলে প্রোফাইল পিকচার নেই, আর
উভচর সম্প্রদায়ের ব্যাসার্ধ ওডিসি-র আকার নিয়েছে।
নলেনগুড়ের ইমিটেশন মিষ্টিতে বাংলা সাবটাইটেল নেই।
অথচ, নীচের দিকে শতরঞ্জি জুড়ে শীতকালিন অধিবেশনে  98.3 FM  its hot ... 

অতীতচারী অপরাহ্নের আগামীকালে চাঁদটির ফুলপিসি তখনও সাক্ষরতা লাভের ক্লাস করছে ...




অভিজিৎ দাসকর্মকার
সম্পাদক-সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল ওয়েবজিন
(কবিতার নতুন দিগন্তের সন্ধানে)
মল্ল সাহিত্য ই-পত্রিকা ( দৈনিক প্রয়াস)

বেদান্ত লিক ডাউন পর্বে শ্রী সেনগুপ্তের লেখা একটি আঞ্চলিক ভাষার কবিতা



২) ফুসমন্তর 
*************
 শ্রী সেনগুপ্ত।

এ গো এ  লুরকা র বাপ 
বিহান লে রাইত ফুন টো বাগাঁয় ক্যানে বসে আছিস?
কাজ কাম কোনোই নাই ফুটুনি মারাছিস?

আকাম এক যনতর লিয়ে ইদিক সিদিক
ঘুরা।
ক্যা জানে গো কি জি আছে উটার ভিতর ভরা।

টুটুং টুটুং ডাইকছ্যে ক্যাবল ঘন্টি মাইর‍্যে মাইর‍্যে।
রাত নাই দুফোর নাই কান পাতা দায় ঘরে।

সুকুম মারে বসগা খানিক বুঢ়া বাপের কাছে।
তা লয়খো
যনতর টো বাগায় ধরে
 ইকা ইকাই লাচে।

ছেল্যা গুলান নুচায় খেচে উয়াদের ও চাই
ফুস মন্তর বললে হব্যেক? 
হামি কুথা পাই?

এ গো এ লুরকা র বাপ 
লাল খাড়ি আর ঝিঙা সিমের ঝাল রাঁধেছি আজ।
আনখা ক্যানে খিচিক মাইর‍্যো 
দমহে লাগে লাজ।

ঢের হঁয়েছ্যে ই সকল প্যাঁদা হরিবোল।
ফুনের পাকে ঢুকল্যে হবেক 
সবেই গলোদ গোল।।

*************
(চেষ্টা মাত্র আঞ্চলিক ভাষায় লেখার। 
সুকুম মারে- শান্ত হয়ে।
নুচায় খেচে-আঁচড়ে দেওয়া।)

বেদান্ত লকডাউন পর্বে প্রাপ্তি মুখোপাধ‍্যায়ের কবিতা

১) বিন পলাশের দোল
-------------------
প্রাপ্তি মুখোপাধ‍্যায়


মোড় ঘুরতেই চা-দোকানের ঘর
বাঁশমাচাতে ধোঁয়ার মেজাজ খোলে,
ঝুল-আলোতে ঘুঁটির সয়ম্বর
টেবিল বাজে তালবেতালের বোলে !

পুব কোণাচে কালচে পাতার গাছ
লালকরবী কোমর ধরে দোলে-
দোলখেলাতে বসন্ত গোছগাছ, 
ওড়নাউড়ান লালদালানের কোলে!

সেসব ঘন ঊনিশকুড়ির মেঘ
রঙবরষা আবীরগুলাল ছাতা,
পাসবুকে রোজ জমাচ্ছে উদ্বেগ 
ফুল বিকিয়ে বাদবাকি সব পাতা--!

মুঠোয় ধরা ভাগ্য কিম্বা দাগ
রমরমিয়ে দখিনা বয় ফ্ল্যাটে--
বুকের মধ্যে অনন্ত যোগভাগ 
আরাধ্য ঘুম অ্যালার্ম শুনে হাঁটে!

তখন তোমার একুশবছর নয়,
গোপন তাপে কোথায় অষ্টাদশী!
এখন ফ্ল্যু আর জমজমাটের ভয়,
কোথাও চলো সময় রেখে বসি--!

এখন তো নেই সূর্যাস্তের রোগ
হাত-ছাড়া নেই বাসস্টপেজের আগে, 
দীন বসন্তে মস্ত হলে যোগ
উপন্যাসে আয়ুর তিলক লাগে!

মোড় ঘুরতে চা-দোকানটা নেই, 
নিয়ন-মেজাজ বক্ররেখা আঁকে<>
পুবকোণাচের পলাশ কুড়োতেই
নস্টালজিয়া আঁচল পেতে রাখে..!

লক ডাউনে বেদান্ত, লিখছেন শ্যামাপ্রসাদ সরকার


ঘ্রাণ 
(সাদাত হাসান মান্টো)
অনুবাদ- শ্যামাপ্রসাদ সরকার

**********

বৃষ্টিতে অশ্বত্থগাছটার পাতা ধুয়ে যাবার পর একটা আচ্ছন্ন করে দেওয়া গন্ধ ঘরটা জুড়ে আছে।  বাইরের ঘরের জানলা দিয়ে দেখতে পেল একটি মারাঠি মেয়ের ছায়াটা এগিয়ে আসছে।  বড় অনুজ্জ্বল বেশবাসের সে। কোথাও যেন তার ঝলমলে ভাবটা সে যেন ভুলে ফেলে এসেছে। ঘরের মধ‍্যে ঢুকে এসে তার মৃদু কম্পন স্পর্শটুকুই সম্বল করে মেয়েটি দু পা এগিয়ে রণধীরের সংলগ্ন  হতে চায়।

এসময় একলা থাকাটা বড় কষ্টকর। যুদ্ধের বাজারে যেন গোটা দেশটায় তালা পড়েছে। ইংরেজী কাগজ একটা আসে বটে, একলা ঘরে নিজের সিঙ্গল বেড নেয়ারের খাটটাতে আধশোয়া হয়ে  কমসে কম সারাদিনে একশোবার পড়ে  বিজ্ঞাপনগুলোও এখন মুখস্থ হয়ে গেছে। এই অনুত্তেজক দিনটায় আপাতত ওই মেয়েটি যদি এইবার একটু আনন্দ দিতে পারে!

ওপারে একটা কাঁটাতারের কারখানা আছে। মেয়েটা বোধহয় ওখানেই মজুরী করে। ওটা একটা ইনকামের উৎস। এছাড়াও টাকা রোজগারের আছে  অন‍্য আরেকটা পথ। সেটা অবশ‍্য সবাইকে ডেকে বলা যায়না।
**************
এলাকার ফিরিঙ্গি মেয়েগুলো এই কদিন আগে পর্যন্ত বেশ সস্তা ছিল। এখন ওদের যুদ্ধের বাজারে সেবিকার কাজে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ সেনাগুলো এখন বুট বাজিয়ে ওদের জন‍্য নির্দিষ্ট পানশালায় যখন যায়, এই মেয়েগুলোই মজুত থাকে সেখানে। দেশী কালোচামড়ার লোককে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়না, এটাই দস্তুর। 

রণধীর মোটামুটি বোম্বাই এর নাগপাড়া থেকে তাজ হোটেল অবধি এলাকায় অনেক ফিরিঙ্গি মেয়ের সাথেই শুয়েছে। ওদের প্রেম ট্রেমের হাজারো ব‍্যর্থতার কাঁদুনির পর ওরা শেষপর্যন্ত  কোনও না কোনও অপদার্থ লোকদেরকেই যে কেন  বিয়ে করে ফেলে সেটা বোঝা দায়!
***********
হ‍্যাজেল নামের ওই ফিরিঙ্গি মেয়েটা রণধীরের নীচের ফ্ল‍্যাটেই থাকে। ছোট করে তার হালফ‍্যাশনের চুলের ছাঁটটার সাথে খুব উদ্ধত বুকদুটো যেন উর্দির বোতাম ছিঁড়ে দৃশ‍্যমান হতে চায়। সে রাস্তায় নামলে লোভী কুকুরের দৃষ্টিতে বাইরে সবাই ওকে চোখ দিয়ে চাটতে থাকে । অবশ‍্য এরকম দেহশৈলী থাকলে লোকে আর কি করবে! হ‍্যাজেল ওসব ভ্রূক্ষেপ করেনা।  তার রুমমেট মেয়েটির সাথে সবরকম গল্প এমনকি অনিয়মিত পিরিয়ডস্ নিয়েও জোরে জোরে আলোচনা করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে  নীচে নেমে আসে। এরা সত‍্যিই একেবারে অন‍্যরকম।  দূর থেকে ভেসে আসা বাজনার আওয়াজ কানে এলে আপনিই এদের পা ' নেচে ওঠে, দোলে কোমরও.....
**************
আজকের আগে রণধীর কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি এরকম একটা গ্রাম‍্য মারাঠি মেয়েকেও তার কখনো প্রয়োজন হতে পারে । মেয়েটা ঘরে ঢোকার পরই ও দেখল একটু আগের হয়ে যাওয়া  বৃষ্টিতে  ভিজে  মেয়েটার কাপড়জামা সবটা সপসপ করছে। এরকম ভাবে আর কিছুক্ষণ চুপ্পুড় ভিজে কাপড়ে থাকলে অন্তত নিউমোনিয়া হয়ে যাওয়াটা বিচিত্র নয়।
 ' কাপড়গুলো আগে ছেড়ে ফেল!'  রণধীর একজোড়া শুকনো কাপড় তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। এইবারে মেয়েটা যেন সম্বিত ফিরে পায়। বুঝতে পারে উন্মোচনের ইঙ্গিতটাই আসলে,  অন‍্যভাবে পেশ হল এতক্ষণে। 

মেয়েটার গায়ে কাঁচুলিটা খুব এঁটে বসে আছে আর এরকম ভাবে ভিজে যাওয়ার জন‍্য গিঁটটাও খোলা যাচ্ছেনা কিছুতেই। মেয়েটা রণধীরকে খুলে দিতে চোখ দিয়ে ইশারা করলো। 

কুমোরের চাকায় একতাল মাটি যে ভাবে পাক খেয়ে কলসীর আকারে সেজে ওঠে, রণধীর পিছন থেকে এসে কাঁচুলির গিঁটটা খুলতেই ঠিক তেমন অনুভূতি হল। নরম পেলব স্তনদুটিতে কেমন যেন মাটি মাটি গন্ধ। বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া অশ্বত্থপাতার শিরায় এমন গন্ধ লেগে থাকে। 
সারারাত ধরে মেয়েটিতে নিবিষ্ট হতে হতে রণধীর টের পাচ্ছিল যে এতদিনকার অভিজ্ঞতার সাথে আজকের রাতটার অনুভূতিটা তার কিছুতেই মিলছে না! কে যেন একটা বৃষ্টিধোয়া সোঁদা গন্ধটা লেপে দিয়েছে কেউ মেয়েটার সর্বাঙ্গেই। ঘাড়, বুক,  নাভী এমনকি  ঈষৎ নরম বগলতলির কেশগুচ্ছে...সবেতেই ওই মাটির গন্ধ। বৃষ্টিধোয়া মাটির সেই খুব চেনা গন্ধটা, আর খুব মনকেমন করা সেই গন্ধ আচ্ছন্ন করে দেয় দেহবিকার।

**************

এই ঘরের এখন আসবাব বেড়েছে। একটা নেয়ারে সিঙ্গল খাটের পাশে এখন আর একটা নতুন খাট এসেছে। এসেছে ড্রেসিংটেবিলও। আবারও একটা বৃষ্টিধোয়া দিন, আবারও একটা ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের উপস্থাপনা হবার আয়োজন চলছে। একজন অত‍্যন্ত ফর্সা যুবতী ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে ধীরে ধীরে উন্মোচন করছে নিজেকে। যুবতীটি রণধীরের সদ‍্য বিবাহিত স্ত্রী। তার লাল রঙের রেশমী সালোয়ারটা আপাতত ইতঃস্তত ছড়ানো। সোনালী ফুলের পাপড়ির মত কামিজটাও বিছানায় এখন খুলে রাখা আছে। সে সলজ্জ ভঙ্গিতে এগিয়ে যায় স্বামীর সদাচঞ্চল হাতদুটিকে পুরস্কৃত করতে। 

রণধীরের হাতটা হাওয়ার মত তার স্ত্রীর সর্বাঙ্গে বেড়িয়ে আসতে চায়। সে নিজের হাতে যত্ন করে ব্রেসিয়ারের হুকটা আলগা করতেই একদলা মাখনের মত সতেজ আর ফর্সা বুকজোড়া তার হাতের নাগালে এসে পড়ে। মেয়েটির শরীরে সবকিছুই যথাযথ ও সুন্দর। অনাবশ‍্যক নির্মেদ, এমনকি দেহসন্ধিগুলিও পরিচ্ছন্ন। 
**************
বাইরে বৃষ্টিধোয়া অশ্বত্থগাছের পাতার গন্ধটা ঘরময় ছড়িয়ে আছে। ঠিক সেদিনকার মতোই। তফাৎ এই যে সেই দরিদ্র মারাঠি মেয়েটার গায়ে মাটির সোঁদা গন্ধটা, ক্ষুধা আর দারিদ্রের ওই করুণ গন্ধটা যেটা তাকে সেদিন বিমোহিত করে তুলেছিল সেটা আজ আর নেই। আজকে সবটা বড় সাজানো,  রক্তশূন‍্য, জীবনহীন আর ফ‍্যাকাশে ঠেকছে যেন। সেই মাটির বনজ ভেজা ঘ্রাণ, আর ভিতরে চারিয়ে যাওয়া  শিকড়ের  ঘ্রাণের সম্মিলীত  অনুপস্থিতিটুকু যেন  নিভিয়ে দিয়ে যাচ্ছে রণধীরকে বারবার। 
***********
কয়েকবার ব‍্যর্থ হবার পর আর একবার, নতুন উদ‍্যমে রণধীর তার নব‍্যবিবাহিত সুন্দরী স্ত্রীর শরীরে নিবিষ্ট হওয়ার জন‍্য মনপ্রাণ দিয়ে সেই ফেলে আসা মাটির গন্ধটাকে নিজের মধ‍্যে পেতে চাইছিল। বাইরে বৃষ্টিধোয়া অশ্বত্থগাছের পাতার ভিজে গন্ধের সাথে যা কবেই ওই গরীব মারাঠি মেয়েটার গায়ের গন্ধের সাথে মিশে এক হয়ে গেছে।
**************************
(সাদাত হোসেন মান্টোর ছোট গল্প 'Smełl" অবলম্বনে)


লেখক পরিচিতি-
******************
সাদাত হাসান মান্টো:: 
*********************
সাদত হাসান মান্টো ১৯১২ এর ১১ মে পাঞ্জাব লুধিয়ানার পাপরউদি গ্রামের ব্যারিস্টার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মান্টোর পূর্বপুরুষ কাশ্মিরী বংশোদ্ভূত ছিলেন। হিন্দী ও উর্দুভাষায় নব্যবাস্তববাদী সাহিত্যের পুরোধা বলা যায় তাঁকে। দেশবিভাগের রক্তাক্ত ইতিকথা বারবার তাঁর ব্যাথিত কলমে মূর্ত হয়ে উঠেছে। নগ্নতা ও অশ্লীলতার দায়ে তিনি অভিযুক্ত হলেও এরকম নির্মম নিস্পৃহতা নিয়ে সেই রক্তস্রাবী ইতিহাসকে কলমে ধারণ করা সহজ কাজ নয়। সাহিত্যের পাশাপাশি  
তিনি একজন বেতার লিপি লেখক ও সাংবাদিকও ছিলেন। তার ছোট গল্পের সংকলন Kingdom's end and other stories, একটি উপন্যাস ,তিনটি প্রবন্ধ সংগ্রহ ও ব্যাক্তিগত স্কেচের দুটি সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। বোম্বাই চলচ্চিত্র জগত অর্থাৎ বলিউডে মান্টোর অজস্র কাজ রয়েছে। বহু সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে প্রথম শ্রেনীর চিত্রাভিনেতা ও পরিচালকদের কাছে মান্টোর কদর ছিল। আট দিন, চল চলরে নওজোয়ান, মির্জা গালিব ইত্যাদি সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটিং তার কৃতিত্ব।
ইসমত চুঘতাই ও কাইফী আজমীর সঙ্গে রয়ে গেছিল আমৃত্যু হৃদ্যতা।
 ক্রমাগত নিম্ন মানের সুরা পানে ‘মান্টো “লিভার সিরোসিস”-এ আক্রান্ত হন। তার জীবনযাত্রা ও ছিল চুড়ান্ত বাউণ্ডুলে এবং বেপরোয়া। শরীরের প্রতি অযত্ন, অপ্রতুল চিকিৎসা, আর্থিক অনটন ইত্যাদিতে জর্জরিত মান্টোর বেঁচে থাকার প্রবল আগ্রহ ব্যাধির কাছে আত্মসমর্পণ করে। ১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি তার অকাল প্রয়াণ ঘটে তার দ্বিতীয় আবাস ভূমি লাহোরে।
****************