শপথ নিলাম (ষষ্ঠ পর্ব )
বীরেন্দ্র নাথ মহাপাত্র
তুহিন যখন অঞ্জনাকে পাঁজাকোলা করে ফিরছিল, সেই সময় উলটো দিক থেকে অন্ধকার ভেদ করে দ্রুত বেগে কি যেন আসছে, নিমেষের মধ্যে দুখানা বোলারো গাড়ি ওর সামনে হাজির হলো । সেই দুখানা গাড়ি জয়রামবাটি থেকে বিষ্ণুপুরের দর্শনীয় স্থান গুলি দেখবার জন্য আসছিল, কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি আসায় কোথাও না দেখে সোজা বিষ্ণুপুর টুরিস্ট লজে ফিরব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ওখান থেকে পরের দিন ভোরে দর্শনীয় স্থান গুলি দেখবে । ততক্ষণে বৃষ্টির বেগ অনেক কমে গেছে, তুহিন তার হঠাৎ বিপর্যয়ের কথা গুলি জানাবার পর তারাই দু -তিনজন মিলে তুহিন এবং হত -চেতনা অঞ্জনাকে একটা গাড়িতে তুলে নিল । গাড়ীগুলি সামান্য কিছুটা যাওয়ার পর হেমাদ্রি ও কিংকিনীকে অন্য গাড়িতে তুলে নিয়ে তাদের গন্তব্য স্থানের দিকে অগ্রসর হলো । কিছুক্ষণের মধ্যে সবাইকে তাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গাড়ীগুলি সেই লজের দিকে অগ্রসর হয়ে গেল । ওরা চারজনে বাড়িতে পৌঁছালো । বিদ্যুতের আলো কিন্তু তখনো পর্যন্ত আসেনি, তাই বাড়ির সামান্য আলোতে অঞ্জনাকে নামিয়ে সবাই মিলে তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করতে লাগল । কিছুক্ষণের মধ্যেই অঞ্জনার জ্ঞান ফিরে এল বটে, কিন্তু ততটা প্রকৃতিস্থ নয় । তাই সে অল্প আলোয় কারও মুখ না চিনতে পেরে তুহিনকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'চল ফিরে চল সোনা ঝুরি গ্রামে, সেখানে আবার তাদের মেয়েকে নিয়ে সুখে শান্তিতে ঘর বাঁধব ,চাই না তোমার চাকুরী, বাবার দোকানকে আবার স্টার্ট করে, দিন গুজরান করতে চাই ।' তখন মামী বাধ্য হয়ে অঞ্জনাকে বলল, ' এ-কি করছিস মা, এ তো তুহিনবাবু, সে তো পদ্মা, ভাগীরথী, জলঙ্গীর সঙ্গম স্থলে হারিয়ে গিয়েছে ।' সঙ্গে সঙ্গে অঞ্জনা তুহিনবাবুকে আরো বেশি করে জড়িয়ে ধরে বলল,' তুমি জানো না মামী, এই আমার হারিয়ে যাওয়া স্বামী, ওকে যখন আজ ঝড়ের রাতে পেয়েছি, একে কোন মতে আর হারিয়ে যেতে দিব না, দেখলে তো মামী আমার সিঁথির সিঁদুরের জোর ।'
তখন মামা ও মামী কিছু বলতে উদ্যত হলে ও হেমাদ্রি তাদের বাধা দিয়ে বলল, 'যে ঘটনা অঞ্জনা এখন ঘটিয়ে চলেছে, এটা একমাত্ৰ মোহিতের অতৃপ্ত আত্মার কারসাজি, অতএব বাধা দিয়ে আর লাভ নেই, এটাই এখন ওর ভবিতব্য । হেমাদ্রির কথা শেষ হওয়ার মুহূর্তে চারিদিকে আলো জ্বলে গেল । ঘরের মধ্যে চারিদিকে আলো জ্বলে যেতে অঞ্জনা ভিজে কাপড়ে তুহিন বাবুকে জড়িয়ে ধরে যে কান্ড এতক্ষণ ধরে করে আসছিল, হুঁশ ফেরামাত্র লজ্জা পেল, তবুও জোর গলায় বলল, ' আমি এখন ও বলছি আমার স্বামী আমার কাছে এসে ধরা দিয়েছিল, তাকে দাদা তুই কোথায় লুকিয়ে রেখে আমার সঙ্গে ছল চাতুরী করছিস, নিজের চোখকে তো কোন মতে আমি কখনও অবিশ্বাস করতে পারি না । ' এই কথা শুনে তার দাদা দৃঢ় কণ্ঠে বলল, 'ভুল করছিস বোন, যেটা তুই দেখেছিস সেটা সেই খানের ঘটনা, যে দৃশ্য আমরা চারজনে মিলে প্রত্যক্ষ করেছি, তারপরে ক্ষণেকের মধ্যে আবার বিদ্যুতের ঝলকানিতে সে বিলীন হয়ে গেল, ও তবে যাওয়ার মুহূর্তে যে অভয় বাণী শুনিয়ে গেছে, সেটা তো নিশ্চয় কানে শুনেছিস, অতএব তোর ললাটে বিধির যে লেখন লেখা রয়েছে তাকে অবনত মস্তকে মেনে নিতেই হবে তোকে, তবে এখন তোর ভাগ্য তুহিনের মা ভগবতী দেবীর অর্থাৎ মাসিমার উপর নির্ভর করছে । তবুও আমার দৃঢ় বিশ্বাস সেই দয়াময়ী মা একজন অবোধ শিশু যে নাকি সদ্য হারা বাবা, দাদু, ঠাকুরমাকে ও হারিয়ে সম্পূর্ণ অনাথ হয়ে গেছে তার কথা চিন্তা করে তিনি কখনও মুখ ঘুরিয়ে নেবেন না । এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস । '
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কিংকিনী দৃপ্তকণ্ঠে বলল, 'আমি আমার মাকে চিনি, সে এখন সম্পূর্ণ আলাদা জগতের মহিলা হয়ে গেছে ; কারণ তার এখন একমাত্র অবলম্বন রাধামাধব, এছাড়া সে সংসারে আর কোন কিছু বোঝে না, অতএব আমার মা খুশী হয়ে এদেরকে সাদরে গ্রহণ করবেই ।'
ঠিক সময় মামা দাদু ও দিদা ঘরে প্রবেশ করল, টর্চ হাতে নিয়ে হেমাদ্রির কপালের দিকে আলো ফেলে হেসে হেসে বলল, 'কিরে দাদুভাই, তোর কপালের ঠিক কোণের দিকে কি যেন লাল টিপ লেগে রয়েছে । '
তখন দিদা বলল, 'তোমার বুড়ো বয়সে কি ভীমরতি ধরেছে । '
প্রত্যুত্তরে ললিত বাবু বলল, ' আরে আমি এখন গাঁজা খাইনি, তাই এত ওলট পালট দেখতে পারি না, দেখ দেখ বুড়ি আমার এই টর্চ নিয়ে আমার দাদু ভাইয়ের কপালে আলো ফেলে দেখ, তখন মিনাদেবী টর্চ নিয়ে দেখল সত্যি ঘটনা । তখন দিদা হাসি মনে বলল, 'কী রে দাদুভাই, তোর দাদুকে মিথ্যে মিথ্যে দোষ দিলাম ; কিন্তু আমি তো স্বচক্ষে যেটা দেখলাম, তা তো এক ভীষণ কান্ড । তুই আবার কখন মেয়ে হয়ে উঠলি, এই তো দেখছি আমার সামনে দাঁড়িয়ে একজন জলজ্যান্ত পুরুষ । অতএব এই ঝড় জলের রাতে কি এমন কান্ড ঘটালি যে তোর কপালের কোণে বিবাহিতার লাল টিপ,নিশ্চয় তুই ভাই কিছুকান্ড ঘটিয়ে ফেলেছিস, সেটা আমাদের কাছে বড়ই দুঃসংবাদ, দেখ ভাই, যে বিশ্রী কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছিস,তারজন্য এক্ষুণি মেয়ের গার্জেন পুলিশ নিয়ে ধরতে আসবে না তো ? ' একথা বলেই দাদু ও দিদা দুজনে খিল খিল করে হেসে উঠল ।
তখন হেমাদ্রি বলল, ' তোমরা কি যে বলছ, তার কোন বাংলা মানে খুঁজে পাচ্ছি না ।'সঙ্গে সঙ্গে নিজের কপালের চারদিকে হাত দিয়ে ঘসতেই লাল টিপ মেঝেতে পড়ে গেল । তখন নিরুপায় হয়ে দুজন দুজনের দিকে আড়নয়নে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের চোখ নামিয়ে ফেলল, তবে সেটা অবশ্য সবার দৃষ্টির আড়ালে । এবার ঠাট্টা তামাশা বন্ধ করে মামা এসে বলল, 'তোমরা একটু চুপ করবে ? এখন সামনে অনেক কাজ, তাই আর কথা না বাড়িয়ে চল সবাই রাতের খাবার খেয়ে দিয়ে যে যার ঘরে শুতে চলে যাও, কালকে সবাই ভোরে উঠে পড়বে ; কারণ দুপুরের মধ্যে তিনজনের অপঘাত মৃত্যুর শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা করতে হবে,তবে সর্বাগ্রে তুহিনবাবুর মায়ের কাছে খবর দিয়ে সঠিক মন্তব্য নিতে হবে, কি ঠিক বললাম না ভাগনা ? ' সবাই খেয়ে দিয়ে যে যার ঘরে শুতে চলে গেল । কিন্তু যে চারজন বেড়াতে গিয়েছিল, তারা কিন্তু কেউই বিছানায় ঘুমাতে পারল না । বিশেষ করে কিংকিনী কেবল একা একা বিছানায় শুয়ে চটপট করতে লাগল, সে মনে মনে ভাবল সে একজন পূর্ণ যৌবনা যুবতী, উত্তেজনা বশতঃ যে কান্ডটা ঘটিয়ে ফেলেছে তার দায় কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে দেহের মধ্যে পরিবর্তন ফুটে উঠবে, যদি সত্যি কিছু ঘটে যায়, তাহলে সে যে সবার চোখে কলঙ্কিনী হয়ে যাবে । ঠিক সেই সময় বিছানায় মোবাইল বেজে ওঠল । চেয়ে দেখল কে যেন তাকে ফোন করছে । তখন ভয়ে ভয়ে ফোনটা ধরল । ফোনে একজন যুবকের কন্ঠস্বর ভেসে এল । 'হ্যালো' আমি হেমাদ্রি বলছি, 'তুমি কোন ভয় পেও না, নিশ্চিত ভাবে জেনে যাও, ওই ঘটনাকে স্বীকৃতি দিয়ে আমি ঘোষণা করলাম, আমরা আজ থেকে হয়ে গেলাম দুজনে স্বামী স্ত্রী, কি ঠিক বললাম না ? তবে আর চিন্তা না করে লক্ষী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে যাও, তাহলে রাখি, এই কথা শোনার পর কিংকিনীর মনে যে চিন্তা ঘনায়ে এসেছিল তা সম্পূর্ণ মন থেকে দূর করে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ল । পরের দিন অর্থ্যাৎ ১৩ ই আগস্ট রবিবার ভোরে সবাই তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল । কিংকিনী বিছানা থেকে ওঠার মুহূর্তে হঠাৎ তার মোবাইলে মায়ের ফোন এল । তখন মায়ের করা দেখে নিজের ফোন তুলল এবং বলল, 'হ্যালো,' বলার সঙ্গে সঙ্গে মা বললেন, 'তোরা কবে নাগাদ আসবি, তবে আসার সময় হেমাদ্রিকে ধরে নিয়ে আসবি, তবে আগ বাড়িয়ে তোকে কিছু বলছি বলে মনে কিছু করবি না, এবার বলছি,তুই এখন পূর্ণ যৌবনা যুবতী, সেদিক থেকে বরাবরের জন্য সাবধান করে দিচ্ছি ; তার কারণ মেয়েদেরকে এই সময় বারবার সাবধান থাকতে হয়, সেটা আর খুলে বললাম না, আমি তোকে ভাল ভাবে জানি ,এখন তুই হয়তো বলবি, দাদাকে ফোন করে আগাম সতর্ক না করে আমাকে কেন সতর্ক করলে ? এই কথাটা তোর মনের মধ্যে নিশ্চয় এসে গেছে, ছেলের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা, সেই কথাটা তোকে আর খুলে বলার দরকার নেই, তবে সেদিন রাতে হেমাদ্রিকে নিজের কোলে নিয়ে পরিচর্যা করে সারিয়ে তুললি, তবে সেটা খুব সাহসী মনের পরিচয়, তবে গার্ডিয়ান হয়ে তাই সতর্কবাণী দিয়ে রাখলাম, তবে এ -ও বলছি যদি ওকে ক্ষণিকের মধ্যে ভাল বেসে ফেলিস, তাতে আমার কোন অমত নেই, তবে নোংরামো পথে পা বাড়াস না, পদে পদে বিপদ আছে, তাহলে এখন রাখি মা ।'
মায়ের অভয়বানী শুনে কিংকিনী মনে মনে মাকে সাধুবাদ জানাল ; কারণ হেমাদ্রির সঙ্গে তার ইতিমধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে, কিংকিনীকে যে মাসিমা ফোন করেছিল, সে কথাটা হেমাদ্রি জানতই না ।
তাই হেমাদ্রি মাসিমা অর্থাৎ ভগবতীদেবীকে ফোন করল । হেমাদ্রির ফোন পেয়ে ভগবতীদেবী বলল, 'তুমি জন্মাষ্টমী ও স্বাধীনতার দুদিন আমার বাড়ি আসছ তো বাবা ? ' তখন হেমাদ্রি বলল, ' সে তো যাবই, তবে যে কথাটা আপনাকে অবগত করাচ্ছি, সেই গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলি আগে শুনুন, বলেই বোনের জীবন এবং বাবার আত্মঘাতী সবই অবগত করল ।' সব কথাগুলি শুনে ভগবতীদেবী কেঁদে কেঁদে বললেন, 'হে দয়াময়, এদের সংসারে একি করলে ঠাকুর ;এই বাচ্চা মেয়েটা তার ছোট বাচ্চাকে নিয়ে কি করে জীবন যাপন করবে, যদি বাবা আমাকে একটু অভয় দাও, তাহলে বলি । '
এই কথা শুনে হেমাদ্রি বলল, ' নিশ্চয় বলুন, আমি শুনবার জন্য আগ্রহ ভরে বসে আছি । ' তখন ভগবতীদেবী বললেন, 'ওই বাচ্চামেয়েটা এবং অনাথ মেয়ের ভার আমার ওপর ছেড়ে দাও, আমি ওর সারা জীবনের ভার নেব । '
তখন হেমাদ্রি উৎসুক মন নিয়ে বলল, ' কি ভাবে নিবেন ? ' তখন তিনি বললেন, ' আমার ছেলে খোকাকে মত করিয়ে পুত্রবধূ রূপে বরণ করে নেব । '
তুহিন হেমাদ্রির কাছ থেকে ফোন নিয়ে মাকে বলল, ' তোমার এই কথা শুনে আমি ও আমার বন্ধু যে আনন্দ পেলাম তা ভাষায় তোমাকে বোঝাতে পারব না, তাহলে এখন আমরা ফোন রাখছি ; কারণ আজকে অর্থাৎ একটু বাদে অঞ্জনার স্বামী,শাশুড়ী ও হেমাদ্রির বাবার অপঘাতে মৃত্যুর জন্য শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হবে, তাই এখনকার মত আমরা ফোন রাখছি । '
তখন মা বললেন, ' ফোনটা রাখিস না, তবে শোন, তোরা সবাই মিলে অর্থাৎ তার বোন, হেমাদ্রি, তার মা, মামা, মামী, তাদের ছেলে, হেমাদ্রির দাদু, দিদিমা সকলে মিলে বিকেলে এখানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে আয়, পরের দিন আমার রাধামাধবের জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠান পালন হবে, ওই দিনই নববধূকে সবার মাঝে আমি বরণ করে নিব, আর শোন,কাল সকালেই তো বড়পিসেমশায় তার সমস্ত পরিবার এবং ছোট পিসেমশায় তার পরিবারের সবাই এসে যাবে, তাহলে আমার অনুরোধ ওনাদেরকে বলে দিবি, ওনারা যেন কোন ভাবে অন্যথা না করেন, এই আশা রেখে ফোন বন্ধ করছি । '
ভগবতীদেবীর কথাকে মান্য করে অঞ্জনার ব্যাপারটা মাথায় রেখে ওখানেই বাড়ির সবাই বৌবাজার অর্থাৎ ভগবতীদেবীর বাড়ি আসার সম্মতি দিল । তাই যথারীতি মোহিত, মোহিতের মা এবং হেমাদ্রির বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দুপুরের মধ্যে শেষ হলো । এই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সকলেই তাড়াতাড়ি দুপুরের খাওয়ার খেয়ে আগেভাগে বাড়ির গেটে তালা দিয়ে বিষ্ণুপুর স্টেশনে চলে এল ।
ঠিক ২.০০টায় মেদিনীপুর আদ্রা মেমু প্যাসেঞ্জার বিষ্ণুপুর স্টেশনে এসে দাঁড়াল । সবাই সেই গড়িতে উঠে পড়ল । যথারীতি সেই গাড়ি ৪.১৫মিনিটে মেদিনীপুর স্টেশনে ১ নং প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াল । ওখানে আসামাত্র হেমাদ্রি যথারীতি সবার টিকিট হাওড়া পর্যন্ত কেটে নিল । তারপর সবাই প্লাটফর্ম পেরিয়ে স্টেশনের বাইরে এসে কিছু জলখাবার খেয়ে নিল । কিছুক্ষণের মধ্যে মেদিনীপুর গামী লোকাল ২ নং প্লাটফর্মে প্রবেশ করল । ওরা ব্রীজ পেরিয়ে ওই লোকাল ৬.১০এর গ্যালপিং হয়ে মেদিনীপুর স্টেশন ছেড়ে গেল ।
৬.৪৫ মিনিটে গাড়িটি খড়গপুর জংশনে ৫ নং প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াল । হেমাদ্রি নিজের শীট ছেড়ে প্লাটফর্মের বাইরে এসে একটু ঘোরাঘুরি করল । লোকাল ছাড়ার মুহূর্তে হেমাদ্রি যেই উঠতে গেল, হঠাৎ তার দু চোখের মধ্যে একটি পোকা বিঁধে চলে গেল । শীটে বসে সে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করল ।লোকালটি চলা অবস্থায় কিংকিনী হেমাদ্রির দু- চোখে অনবরত জলের ঝাপটা দিয়ে ও কোন সুফল লাভ করতে পারল না । এ সময় হেমাদ্রির ডান চোখ দিয়ে একটু রক্ত গড়িয়ে পড়ল, কিংকিনী তখন রুমাল দিয়ে রক্তটা মুছে দিল । গাড়িটা বাগনান স্টেশনে চলে এল । এদিকে হেমাদ্রির চোখের যন্ত্রণা যখন কোন মতে কমছে না, তাই বাধ্য হয়ে কিংকিনী দাদা তুহিনকে বলল, 'জানিস দাদা, চোখ বলে কথা, তুই ওদের নিয়ে চলে যা, আমি ওকে নিয়ে এখানেই কোন নার্সিংহোমে চোখের ডাক্তার দেখিয়ে পরের গাড়িতে ওখানে চলে যাব । '
অন্য সবাই আমতা আমতা করলেও ওদের কথায় কান না দিয়ে অগ্রণী হয়ে কিংকিনী হেমাদ্রিকে নিয়ে ওই স্টেশনে নেমে গেল । স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে কিংকিনী কথা বলে উনার নির্দেশ মত নার্সিং হোমে না গিয়ে বাগনান রুরাল হাসপাতালে হেমাদ্রিকে নিয়ে গেল, ওখানের হাসপাতাল সুপারের সঙ্গে কথা বলে সঙ্গে সঙ্গে চক্ষু বিভাগে হেমাদ্রিকে ভর্তি করে দিল এবং সুপারের বিশেষ কেয়ারে চক্ষু বিভাগের একজন সিনিয়ার চক্ষু সার্জেনকে বিশেষ কল করে রোগীকে বিশেষ যত্ন নিয়ে দেখতে বললেন ।
চক্ষু বিভাগের সার্জেন এসেই ভারপ্রাপ্ত ওয়ার্ডের নার্সকে সঙ্গে সঙ্গে একটি ইনজেকশন দিতে বললেন, যাতে রোগীর চোখ দুটিতে ইনফেকশন আর না ঘটে এবং খানিকক্ষণ বাদে আর একটি ইনজেকশন ডাক্তারবাবু নিজে রোগীকে দিলেন পরে বাড়ির লোক অর্থাৎ কিংকিনীকে বাইরে থেকে একটা দামী ট্যাবলেট আনতে বললেন । আনার পর নার্সকে দিয়ে খাওয়াতে বলে গেলেন এবং যাওয়ার সময় নার্সকে বলে গেলেন, 'আপনি ঔষধ টা সময় মেনে খাওয়া বেন, কিছুক্ষণ বাদে তিনি মোটামুটি অপারেশন করার মত দরকারী যন্ত্রপাতিগুলি যেন হাতের কাছে পান ।' এই বলে তিনি অন্য
ওয়ার্ডে ভিজিটে গেলেন ।
ডাক্তারবাবু চলে যাওয়ার পর নার্সকে কিংকিনী সাহস করে জিজ্ঞাসা করলেন, 'চোখ দুটির অবস্থা এখন আপনার কেমন মনে হয় । 'প্রত্যুত্তরে নার্স বললেন, 'আমি তেমন কিছু না জানলেও আমার মনে হয় রোগীর ডান চক্ষু থেকে রক্ত বের হয়েছে, তার জন্য তিনি বিশেষ প্রটেকশন নেওয়ার জন্য এই কথা বলেছেন । ' তখন রাত ৯.৩০ মিনিট । এদিকে তুহিন কিংকিনীকে ফোনে বলল, ' আমরা সবাই এইমাত্র ঘরে এলাম, এসেই তোকে ফোন করলাম, হ্যাঁরে , হেমাদ্রি এখন কেমন আছে রে ?'
তখন কিংকিনী বলল, ' যন্ত্রণা টা একেবারেই নেই, তবে ডাক্তারবাবুর কাছ থেকে যতক্ষণ না ভাল সংবাদ না জানতে পারছি, ততক্ষণ কোন কিছুই সাহস করে বলা যাবে না, তাহলে রাখছি । '
এবার কিংকিনী ভাবল এটা তো একটা হাসপাতাল তাই কোন মতে পুরুষ বিভাগে থাকতে দিবেই না । অতএব সেই চিন্তা করে তৎক্ষণাৎ হেমাদ্রিকে বলে গেল, ' আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, নিমেষেই চলে আসব । ' এই কথা বলে সে হাসপাতালের চত্বর থেকে একটু দূরে চলে এল । সে যা মনে ভাবল তাই করে ফেলল । সে একটা মনোহারী দোকান থেকে একটা সিঁদুর কৌটা কিনে ফেলল, তারপরে সে একটু আলোর বাইরে গিয়ে তার ব্যাগ থেকে আয়না বের করে খুব ছোট্ট করে সিঁথিতে একটু সিঁদুর লাগিয়ে ব্যাগ থেকে একটা লালটিপ বের করে কপালে পরে নিয়ে সোজা হেমাদ্রির কাছে হলে এল ।
রাত্রি ৯.৩০ মিনিট বাজার সঙ্গে সঙ্গে সেই ডাক্তারবাবু এসে নার্সকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখন এই রোগীর কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা ?'প্রত্যুত্তরে নার্স বললেন, 'সেই ট্যাবলেট খাওয়ানোর পর কোন উপসর্গ দেখা দেয়নি । ' ডাক্তারবাবু বাড়ির কোন লোক আছে কিনা জানলেন ।
আগ বাড়িয়ে কিংকিনী ডাক্তারবাবুকে বললেন, ' আমি ওঁর স্ত্রী, আমার আর সঙ্গে নেই, অতএব দয়া করে এই রাতটা যাতে রোগীর কাছে থাকতে সম্মতি দেন, তার জন্য অনুরোধ রাখছি, আমি জানি এটা পুরুষ বিভাগ, তাই কোন মতে মহিলাকে বিশেষ করে একজন যুবতীকে অনুমতি দেওয়া গর্হিত অপরাধ । ' ডাক্তারবাবু ভাবলেন একজন বিপদ গ্রস্তা যুবতীকে বাইরে বের করে দেওয়া সেও চরম অপরাধ । তাই অনেক চিন্তা করে তিনি নার্সকে বললেন, ' আমি এক্ষুণি রোগীর ডান চোখটা তুলো দিয়ে গজ কাপড় বেঁধে দেব, তারপর যে যে ঔষধগুলো লিখে দিব, সেই সব ঔষধগুলো কিছু পাওয়া গেলেও বিশেষ কয়েকটা দামী ঔষধ বাইরে থেকে এনে দিতে বলবেন, তবে রোগীর ভাগ্যজোরটা খুব ভাল, তাই যে সব ঔষধ লিখে দেব, সে গুলি খেলেই মনে হয় সাময়িক ভাল হয়ে যাবে । 'ডাক্তারবাবু এবার তাঁর স্ত্রীর উদ্দ্যেশ্যে বললেন, ' শুনেছি আপনাদের বাড়ি কলকাতায়, তাই বলছি ওনার ডান চোখের ব্যান্ডেজ খোলার পর অর্থাৎ ঔষধ গুলি শেষ হলেই আর একবার ভালো করে পি.জি. হাসপাতালে খুব ভালো চোখের সার্জেনকে দেখিয়ে নিবেন ; কারণ ডান চোখটা হয়তো চিরদিনের মত নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তাই ঔষধ খাওয়ার শেষে যদি এই চোখটা দিয়ে উনি ঝাপসা দেখেন, তাহলে একেবারেই দেরী না করে ওই হাসপাতালে ডাক্তার বাবুর পরামর্শ মতো ব্যবস্থা নেবেন, হয়তো খুব তাড়াতাড়ি চোখটা অপারেশন করতে হবে, এই সতর্কবাণী দিয়ে গেলাম । '
পরে ডাক্তারবাবু নার্সকে বললেন, 'আমার কাজ শেষ হলে পর ওনাকে এই রাতের মত একেই বেড়ে থাকবার জন্য অনুমতি দিবেন । 'এদিকে ডাক্তারবাবু নার্সকে নিয়ে প্ৰায় আধ ঘন্টার মধ্যে সব কাজ সমাধা করে ফেললেন এবং হাসপাতালের ব্যবস্থা পত্রে ঔষধ গুলি সব লিখে দিলেন, যে গুলো এই হাসপাতাল থেকে পাওয়া যাবে, সেগুলোতে দাগ না দিয়ে যেগুলো বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে সেগুলো দাগ দিয়ে কিভাবে খাওয়ানো হবে, সব নির্দেশ দিয়ে দিলেন এবং রোগীর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন, ' আজ সকালে ভিজিটে আসার পর রোগীর সব কিছু দেখে নেওয়ার পর তবে ছুটি মঞ্জুর করব, তার আগে রোগীকে নিয়ে বাড়ি চলে যাবেন না । '
এই কথা বলে ডাক্তার বাবু ওয়ার্ডের বাইরে চলে গেলেন ।
আর এদিকে রোগীদের রাতের খাবারের গাড়ি ওয়ার্ডে প্রবেশ করল ।সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ড মাস্টার এসে বললেন, ' 'রোগীর খাওয়ার পর রোগী ছাড়া অন্য কেউ থাকবেন না । ' এই কথা তাঁর শেষ হতেই দায়িত্ব প্রাপ্ত নার্স উনাকে বললেন, ' এই রোগীর স্ত্রীকে এই রাতে থাকার জন্য বিশেষ অনুমতি ডাক্তারবাবু দিয়ে গিয়েছেন ; কারণ ওনার বাড়ির অন্য কেউ নেই, সেই কথা ভাবা তিনি বিশেষ অনুমতি দিয়ে গেছেন । ' ওয়ার্ড মাস্টার আর ওনার থাকার ব্যাপারে কোন কথা না বলে বাইরে চলে গেলেন ।
রোগীর খাওয়ার একমাত্র রোগীদের জন্য, অন্য কারো জন্য নয়, তাই কিংকিনী হেমাদ্রিকে খেতে দিলেন । তখন হেমাদ্রি বলল, 'তুমি এখন কি খাবে ? '
তখন কিংকিনী বলল, ' আমি যখন বাইরে ঔষধ কিনতে যাব, তখন সেইখানে কিছু খেয়ে নেব, আমার জন্য কিছু চিন্তা করতে হবে না তোমাকে ।' হেমাদ্রির খাওয়া শেষ হওয়ার পর কিংকিনী কথামত আগে সব দরকারী ঔষধ গুলি কিনে সামান্য জল খাওয়ার খেয়ে অতি সত্বর সেখানে চলে এল ।
তবে প্রবেশ করার সময় নৈশ প্রহরীর বাধা পেলে ও বিশেষ অনুমতি পত্র দেখানোর পর তাকে প্রবেশ করার জন্য তেমন বেগ পেতে হলো না । সে হেমাদ্রির কাছে আসা মাত্র অন্য একজন নার্স তাঁকে বললেন, 'আপনার থাকার অনুমতি পত্র আছে তো ? ' তখন কিংকিনী উত্তর না দিয়ে অনুমতি পত্র দেখিয়ে দিল, তখন নার্স বললেন, ' আপনি যখন রাতে থাকছেনই, অতএব রোগী রাতে আধঘন্টা অন্তর মোট চারটি ট্যাবলেট ভোর ৬.৩০ মিনিট পর্যন্ত খাবেন, তবে আমি তো থাকবই, তবুও আপনাকে একটু সজাগ করে দিলাম । যদি কারও ঘুম ধরে যায়, ' এই কথা বলে তিনি একগাল হাসি হাসলেন । রাত যখন ক্রমশঃ গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল তখন সব রোগী ঘুমে অচৈতন্য একমাত্র দায়িত্ব প্রাপ্ত নার্স এবং কিংকিনী প্রায় জেগেই থাকল । আর এদিকে হেমাদ্রির পাশে থাকা অর্ধাঙ্গিনীকে বলল, ' তুমি বোধ হয় কিছু খাওনি ।' তখন কিংকিনী প্রত্যুত্তরে বলল, 'জান না বুঝি, রোগীর পাশে থাকলে তাকে অল্পই খেতে হয় ; কারণ ভারী খাওয়ার খেলে ঘুম এসে যাবে, রোগীর কথা মাথায় রেখে একটু হালকা টিফিন খেতে হয় । 'প্রত্যুত্তরে হেমাদ্রি বলল, ' তুমি আমাকে এত ভালবাসো বুঝি ? তা না হলে এ -রকম অভিনয় করে এক রাতের স্ত্রী সেজে নিলে, তারপর টাকা দিয়ে সব ঔষধ কিনে আনলে, সর্বোপরি এক বিছানায় সর্বসমক্ষে শুয়ে পড়লে । '