অর্ধনারীশ্বর
***********
- শ্যামাপ্রসাদ সরকার
গোলাঘরের সামনে একটা মস্ত কাঁঠালগাছ। গাছটার বয়স হয়েছে। এ বাড়ির কর্তার একসময়ে ইচ্ছা হয়েছিল আম কাঁঠালের বাগান করবেন, করেওছিলেন। এখন সব যেতে যেতে বসত ভিটা, দোলমঞ্চ আর কাঁঠালতলাটাই রয়ে গেছে।
দুই শরিকের সম্পত্তি। দুপক্ষই এখন নিছক মধ্যবিত্ত। অবস্থা পড়তির দিকে। দুটো বড়ো গোলা আর একচিলতে উঠোনটা তাও আছে। যার যা ভাগে পড়েছে তা আগেই বেচে দিয়ে শহরে চলে গেছে। এত হাতবদলেও রয়ে গেছে সেই দোলমঞ্চ আর বসতভিটেটুকুই।
আমরা ছেলেবেলায় দোলের আগে দেশের বাড়ি যেতাম। দোলমঞ্চটা ওই কদিন সেজে উঠত আর কীর্তনের বোলে নেচে উঠত। ননীগায়েনের বায়না হত অষ্টপ্রহর সংকীর্তনের। গ্রামশুদ্ধ লোক অাসত তা শুনতে।
ও তরফের শুধু এক জ্যাঠামশায় ছিলেন। খুব বুড়ো নন, তবু বাবা বড়দা বলতেন। তিনি কখনও চাকরিবাকরী করেননি। দেশে থেকে জায়গাজমি দেখতেন। এমনিতে শান্ত নিরীহ হলে কি হবে ওনার মাথার গোলমাল বাধত হঠাৎ করেই। চৈত্র বৈশাখে শুনেছি ওপরের দোতলার ঘরে তালা দিয়ে রাখতে হত। মুনিশ ছিল একজন। সেই কেবল সামনে ঘেঁষত তখন, চান খাওয়াও করিয়ে দিতে হত তখন।
মাথার ব্যামো বাড়লে সামনে কেউ এলে লাঠি হাতে তাড়া করতেন। বলাবাহুল্য কাপড়চোপড় ঠিক থাকতনা তখন। বাড়ির বৌ-ঝি'রা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সরে যেত আর আড়ালে কি সব বলাবলি করত। মনে আছে উনি ওই কাঁঠালতলাটায় লাঠি হাতে চুপ করে কখনো বসে থাকতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। কি উদাস নির্বিকল্প দৃষ্টি তাঁর তখন। ঠিক একটা মূর্তির মত মনে হত তখন তাঁকে।
শুনতে পেতাম ওঁর স্ত্রী নাকি ওই কাঁঠালগাছে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সেকালে পুলিশের অত ঝামেলা ছিলনা। অত বড় বংশের ব্যাপার, গ্রামের মাতব্বরেরাই থানা পুলিশ সব সামলে দিয়েছিল। আর তারপর থেকেই মাথার অসুখটা বাড়ে। সবাই বলত জ্যেঠিমা মারা যাবার পর জ্যেঠামশাই জ্যেঠিমার কাপড়চোপড় পড়ে এমনকি কপালে সিঁদূর ধেবড়ে বসে থাকতেন একটা অর্ধনারীশ্বর সেজে। ওনার টকটকে ফরসা থলথলে গা'য় সেই অদম্য নারীবেশে লোকের ভয় করতো। জ্যাঠামশায় কিন্তু নির্বিকার হয়ে থাকতেন। রাতের বেলা মুনিশ ওর ঘরে শুতো, লোকে তাই নিয়েও দু'কথা বানাতে ছাড়তো না। জ্যেঠামশায়ের পুরুষত্বহীনতাই নাকি জ্যেঠিমার আত্মহননের কারণ বলত সবাই।
আমরা তখন বোধহয় তেরো কি চোদ্দ হব। দোলের সময় দেশে গেছি, আমাদের বন্ধু হরিশ কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ ছুটে এল। ওকে নাকি বিস্কুটের লোভ দেখিয়ে জ্যেঠামশায় নিজের ঘরে ডেকে জোর করে ওর হাফপ্যান্টটা খুলে.....
এ খবর রটতেই অনন্তকাকা মানে হরিশের বাবা পাড়ার লোকজন ডেকে জ্যেঠামশায়কে বেধড়ক মার মারলো। আশ্চর্য, উনি অত বড় বংশের ছেলে, পাগল হলেও মানী লোক, তাও তাকে কেউ বাঁচাতে এলনা। একটা লালপেড়ে শাড়ি কোনওমতে জড়িয়ে আদুল গায়ে বসেছিলেন। প্রায় স্খলিতবসনেই চুপ করে মার খেতে লাগলেন বিনা প্রতিবাদে। শেষে বাবাদের হস্তক্ষেপে ওপরের ঘরে তালাবন্ধ করে রাখা হল। আমাদের স্বাভাবিকভাবেই যত্রতত্র বেড়ানোয় বাধা পড়লো।
সেবার দোলের আড়ম্বরে একটু বিঘ্ন ঘটল। দুপুরে ভোগের থালা ওঁর ঘরে দিতে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো মুনিশ। নিজের বন্ধ ঘরে জ্যেঠিমার সমস্ত গয়না গায়ে পরে,সারা দেহে আবির মেখে , চোখে ধ্যাবড়া কাজল আর টকটকে লাল সিঁদূরের টিপ পড়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ জ্যেঠামশায় একটা গরদের কাপড় দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে কড়িকাঠ থেকে নিষ্প্রাণ হয়ে ঝুলে আছেন। ওহ্! কি বীভৎস সেই দৃশ্য।
গলায় ফাঁস লেখে প্রাণবায়ু বেড়িয়ে যাবার সময় মল ও মূত্রের সাথে সামান্য আঠালো বীর্যরস বেরিয়ে জ্যেঠামশায়ের পুরুষাঙ্গটিকে আজীবনের ব্যর্থতার অপমান থেকে চিরকালের মত মুক্ত করে দিয়ে গেছে ।
*************************
No comments:
Post a Comment