Sunday, May 3, 2020

কাশ্মীরি সাহিত্য মুস্তাক বি বার্ক এর লেখা একটি গল্প



শাস্তি

মুস্তাক বি বার্ক

লোহার কপাটের পেছনে কুঁচকানো ঝাড়, ড্যানিশ একটি উলটানো গাঁদার মতো নিচু হয়েছিল। তাঁর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলো তাঁর মাথার টাকের মতোই প্রকাশ হীন ভাবে পড়েছিল। তাঁর মাথাটা দুটো ভঙ্গুর বাহুর মাঝে কোনক্রমে রাখা ছিলো। পেছন থেকে তাঁর কাঁধের দিকটা দিকে মনে হচ্ছিল যেন পাহাড়ের ওপরে, কোন উপত্যকায় বোম  ফেলার পর যেমন বিধ্বস্ত হয়ে থাকে ঠিক সেরকম। তাঁর সারা শরীরের জরাজীর্ণ ধ্বংসস্তূপের ওপর টাক মাথাটা অক্ষত অবস্থায় নিজের উপস্থিতির জানান দিচ্ছিল। তাঁর দুটি নগ্ন বাহুর মাঝে তাঁর অক্ষত মাথাটি যেন মৃত্যু উপত্যকায় আশার আলো হয়ে জাগ্রত ছিলো।

কয়েকটা লোহার কপাট ড্যানিশকে সারা বিশ্ব থেকে আলাদা করে রেখেছিল। তাঁর উপস্থিতিটা ছিল অনেকটা একটি আধুনিক চিত্রের মতো, যেখানে তাঁর মাথা একটি ফ্রেমে আর বাকি অঙ্গ গুলো অন্যান্য ফ্রেমের মধ্যে বন্দী করা হয়েছিল। তাঁর সমগ্র শরীরের এক একটি অঙ্গ এক একটি আলাদা চিত্রের মতো অনেক কিছু জানান দিচ্ছিল। লোহার কপাট গুলি এক একটি আলাদা ফ্রেমের মতো তাঁর শরীরের অঙ্গ গুলিকে সচল এবং অচল এই দুটি ভাবে বিভক্ত করে ফেলেছিল।

এই অন্ধকার কুঠুরি যেন একটি মৃত্যু উপত্যকা, এই মৃত্যু উপত্যকা থেকে জীবনের সাথে যোগাযোগ করার একমাত্র মাধ্যম ছিল তাঁর কুঁচকানো মাথার ওপরের ছোট্ট একটি জানালা। যেখান থেকে ছিটেফোঁটা জীবনের আলো এসে উঁকি দিয়ে যেতো। এই কারাগারের প্রতিটি দেওয়ালের পেছনে নির্যাতনের এক একটি ভয়ংকর চিত্র ছিলো, ড্যানিশের চিত্রটা ধীরে ধীরে আবঝা হয়ে মুছে যাচ্ছিল।

তাঁর কুঠুরির কপাট গুলো মরচে ধরে এমন অবস্থা হয়েছিল, যা তাঁর ওপর যে নির্যাতন চলেছে তাঁর প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাঁর শরীরটা জঞ্জালের মতো এক কোনায় পড়েছিল। চারপাশ দিয়ে মানুষের মলমূত্র স্রোতের মতো বইছিল। নোংরা দমবন্ধ করা গন্ধের মাঝে বমির শব্দ আবহ সঙ্গীতের মতো কাজ করছিল। কোনরকম বিচার ছাড়াই নিরপরাধ ড্যানিশকে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছিল।

তাঁর আপাত দৃশ্য মৃত শরীরের ভেতরে অত্যন্ত গভীরে প্রাণের স্পন্দন এক সরু নালার মতো বয়ে চলেছিল। তবে এই ভয়ঙ্কর অত্যাচার সহ্য করেও যে সে জীবিত ছিল, এটা তাঁকে এক অবতারে পরিণত করেছিল। কারন একজন অবতার ছাড়া কারুর পক্ষে এইভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিলো না। তাঁর উপস্থিতিটা ছিলো অনেকটা এক বিশাল বট গাছের নীচে এক ধ্যানস্থ মহামানবের মতো, যে ধ্যানস্থ অবস্থায় নিজের অস্তিত্বকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিল। তাঁর চারপাশে প্রহরীদের উপস্থিতিটা অনেকটা বিষ বৃক্ষের ছায়ার মতো, যার বিষাক্ত উপস্থিতি একজন নিরপরাধ, অসহায় মানুষকে শয়তানের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করে। কিন্তু ড্যানিশ সব অত্যাচার সহ্য করে এক ধ্যানস্থ যোগীর মতো পড়েছিল।

দুপুরবেলা একজন প্রহরী একটা স্টিলের লাঠি দিয়ে কপাট গুলোতে আঘাত করলেন। রোজ দুপুরের খাবার দেওয়ার আগে এই প্রহরীর আগমন হতো। ড্যানিশ মাথা তুলে সেই প্রহরীর দিকে তাকানোর চেষ্টা করলো, সে তাঁর হাত পা গুলো একটা নাড়ানোর চেষ্টা করে বিফল হল। কারন তাঁর সারা শরীর সেঁকল দিয়ে বাঁধা ছিল।

একটি খাবারের প্লেট তাঁর কপাটের ফাঁক দিয়ে দেওয়া হলে, সে কোনক্রমে সেটা নিজের কাছে নিয়ে আসে। প্লেটের ওপর রাখাছিল, এক মুঠো ভাত, শুঁকনো রুটি আর এক বাটি স্যুপ। ক্ষুধার্ত ড্যানিশ কিন্তু সেই খাবার মুখেও তুলতে পারলেন না, কারন সেই খাবার দিয়ে অত্যন্ত নোংরা গন্ধ আসছিল। খাবার ইচ্ছাটা প্রায় চলে গেছিল, সেই সময় তিনি সামনের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে একটা আবঝা ছবি দেখতে পেলেন। কোন এক বন্দী এই ছবিটা এঁকেছিলেন। এক মহিলা কোলে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ড্যানিশ সব কিছু আবঝা দেখছিল, কারন ভয়ংকর অত্যাচারের ফলে তাঁর চোখটাই নষ্ট হয়ে গেছিল।

ড্যানিশের মনে হল মায়ের বাহু দুটো বিশাল প্রশস্ত হয়ে গেলো, যেটা ধীরে ধীরে তাঁকে আলিঙ্গন করলো। ড্যানিশ নিজেকে বাচ্চাটার জায়গায় দেখতে পাচ্ছিল। মায়ের হাত দুটো তাঁর সারা শরীরে তাঁর স্নেহের স্পর্শে বোলাতে লাগলো। মায়ের স্পর্শে সে ধীরে ধীরে যেন সুস্থ হয়ে উঠছিল। অনেকদিন পর এরকম স্নেহের স্পর্শ পেয়ে সে কেঁদে ফেলল। মায়ের শক্ত আলিঙ্গনের মাঝে সে নিজেকে অত্যন্ত নিরাপদ মনে করছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল যেন সে মৃত, কিন্তু তাঁর পেটটা তখনো ওঠা নামা করছিল। চিত্রটা অনেকটা এমন ছিল, যেন কোন এক প্রাচীন মন্দিরের গুপ্তধনকে কোন এক সাপ রক্ষা করছিল।

এমন সময় তাঁর বাহু দুটো খুলে গেলো। এক প্রচণ্ড ধাক্কায় তাঁর সারা শরীর কেঁপে উঠল। চারিদিক অন্ধকার, সেই অন্ধকারের মধ্যে যেন সে পথ খুঁজে চলেছে। এবং সে বাইরে আসার সব রকম চেষ্টা চালাচ্ছে।

এমন সময় তাঁকে শক্ত খসখসে পাথরের মেঝের ওপর ফেলে দেওয়া হল, তাঁর মাথা প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হয়ে উঠল। শরীরের যে কটা হাড় তখনো অখণ্ড ছিল, সেগুলো ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো। নিত্যদিনের মতো কয়েকজন হাতে রড নিয়ে তাঁর ওপর অত্যাচার চালাতে থাকলো।

ড্যানিশের ওপর দীর্ঘদিন অত্যাচার করতে করতে তাদের যেন একটা মায়া পরে গেছিল। তাই যখন ড্যানিশের থেকে কোন স্পন্দন তারা পাচ্ছিল না, তখন তারা কাঁদতে লাগলো। জেলার জেলের ডাক্তারকে খবর দিলো। ডাক্তার ড্যানিশকে মৃত ঘোষণা করল।



No comments:

Post a Comment