Sunday, September 1, 2019

শ্যামা প্রসাদ সরকারের লেখা


গুহাচিত্র

শ্যামা প্রসাদ সরকার 

 
চতুর্দিক শৈলশানুতে আবৃত ও জঙ্গলাকীর্ণ। প্রকৃতি প্রায় রুক্ষ ফলতঃ শষ্পসকল তাই পর্ণমোচী অরণ্যবহুল। বিশালাকৃতি প্রস্তর খন্ড ইতঃস্ততঃ বিক্ষিপ্তাকারে নিক্ষিপ্ত কোন আদিকাল থেকেই। বর্ষা আসতে বেশ দেরী। অগ্নিপিন্ডের মত তেজঃকীর্ণ প্রভাকরের ঔজ্জ্বল্য বড়ই  পীড়াদায়ক।

আজ শিকার প্রতিযোগিতার দিন। শিকার আহরণে যে পুরুষ নিপুণ ও বেশী সংখ্যক পশুবধ করবে গোষ্ঠীপতির কন্যা অজ্জা স্বয়ংবরা হয়ে তার হাতে একটি শালপত্র প্রদান করে রাত্রিযাপন করবে এক বর্তুলাকার পর্ণকুটিরে। প্রিয়মিলন তৃপ্তিকর  হলেই পূর্বাহ্নের আগে পুনরায় একটি মৃগ বধপূর্বক তার রুধিরের টীকা কপালে অলঙ্কৃত করে আগামী দিনের জীবনসঙ্গীর মর্যাদা লাভ করবে যুগলে।

আপাততঃ গোষ্ঠীটিতে চারজন যুবক উপস্থিত। দম্ম,ক্ষর্প, পল্ল আর জাগ্র। যুবাদের মধ্যে পল্ল আর জাগ্র দুই ভ্রাতা। এরা প্রকৃতিগত ভাবে শিল্পী স্বভাবের। পল্ল মৃতপশুর অস্হি দিয়ে বাদ্যযন্ত্র তৈরী করে ও বাজায়। তার সুরধ্বনিতে চতুর্পাশ্বে মায়াময় সুরতরঙ্গ প্রবাহিত হয়। জাগ্র ছবি আঁকে। প্রকৃতির ভিতর থেকে উপাদান সংগ্রহ করে সে। কল্লাজ পাথর আর বিভিন্ন বস্তুদিয়ে গুহাগাত্রে সে নানা বিষয়ের চিত্র অঙ্কণে পটু। তার অঙ্কিত চিত্রগুলিতে শিকার সম্বন্ধীয় অলংকরণই বেশী। বিপরীতে দম্ম ও ক্ষর্প কোপন স্বভাবা। পক্ষকাল পূর্বে দম্ম একটি ভল্লুককে বিনা অস্ত্রে বধ করে তার চর্মটি নিজের  গুহার সামনে সাজিয়ে রেখেছে। পশুটির দশনবিকশিত মুখটি মৃত হলেও বীভৎস। ক্ষর্প তুলনায় ধীর। সে শক্তির সাথে বুদ্ধির প্রয়োগে কৃতবিদ্য।  ভল্লুকের সঙ্গে বিনাঅস্ত্রে অসম যুদ্ধে সে অবতীর্ণ হত না।অন্ততঃ যুদ্ধোপযোগী অস্ত্র সে দ্রুত নির্মাণ করেই সমরে প্রবৃত্ত হত তা বলা বাহুল্য। 

অরণ্য শ্বাপদ সংকুল। বন্য ব্যাঘ্র প্রায়ই গুহাকন্দর থেকে নরমাংসে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি নির্বাপন করে। এছাড়া, বরাহ, শৃগাল, ভল্লুক ও বিষধর সর্প বনাঞ্চলে সুলভ। ভীতির সঙ্গে ময়ূর, চিত্রিত মৃগযূথ ও কৃষ্ণসার মৃগ বনের শোভা অবশ্যই  বৃদ্ধি করে। 

একটি কৃষ্ণসারকে অনুগমন করে দম্ম। তার ইচ্ছা জীবন্ত পশুটির বিনিময়ে অজ্জাকে লাভ করা। অজ্জা হরিণশিশুদের স্নেহ করে তা তার অজানা নয়। কিন্তু বিধিবাম তার। কৃষ্ণসারটিকে বাহুলব্ধ করার মুহূর্তে একটি বিষধর সর্প তাকে দংশন করে। নিমেষেই দম্ম অসহায়ের মত মৃত্যু বরণ করে। সেই সংবাদ গোষ্ঠীপতি বক্কের কাছে পৌঁছনোর সাথে সাথে সেদিনের মতো  প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়ে যায়। সর্বাঙ্গে মৃত্তিকা ও পর্ণরস লেপন করে দম্মের দেহ নিকটস্হ জলপ্রপাতে বিসর্জন দিয়ে দেয়  সবাই।

 দম্মের একটি শিশু ভ্রাতঃষ্পুত্র আছে। তাকে সবাই তীক্ষ্ণ বলে সম্বোধন করে। সে সবে হাঁটতে শিখেছে। টলোমলো পায়ে সে কৃষ্ণকায় প্রস্তরের উপর অপরূপ ভঙ্গিতে হাঁটে। তার নগ্ন গাত্রবর্ণ প্রস্তরের সাথে মিলিত হয়ে অপরূপ দৃশ্যের জন্ম হয়।
 জাগ্র শিশুটিকে প্রশ্রয় দেয়। তার চিত্রাঙ্কনের সময় সে গুহামধ্যে এসে রঙ ও মাটি নিয়ে খেলা করে।

দম্মের মৃত্যুতে গোষ্ঠীতে সেদিন উপবাস পালিত হয়। অজ্জা অনাগত জীবনে অমঙ্গলের আশংকায় তটস্হ থাকে। রাত্রিকাল জুড়ে অবোধ্যভাষায় তারা শোকবিলাপ করে।  গুহার বাইরে জ্বলে সদ্য লব্ধ অগ্নিকুন্ড।

তীক্ষ্ণ অলক্ষ্যে জাগ্রের গুহায় প্রবেশ করে। জাগ্রের গুহা আজ নিষ্প্রদীপ। সে ঠিক ঠাহর করে খুঁজে নেয় রঙের পাত্র। দুটি কচি হাত বর্ণময় করে সে বের হতে উদ্যত হতেই ঘটে বিপদ। গুহার মধ্যে একটি  তরুণ ব্যাঘ্রশাবক আত্মগোপন করে ছিল এতক্ষণ। শিশুটি নিষ্ক্রান্ত হতেই সে আক্রমণ করে। চিৎকারে সকলে ছুটে আসে। জাগ্রের বল্লমে সেটি তৎক্ষণাৎ হত হয়। 
কিন্তু হত্যার পূর্বেই সে শিশুটিকে বধ করে ফেলে। অর্ধভুক্ত তীক্ষ্ণের দেহ দেখে সংজ্ঞা হারায় তার মাতা রত্তি। 

একই দিবসে দুটি মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বক্ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বনান্তরে গমন করার। 
পরদিন দলবদ্ধ হয়ে সকলে এই প্রাচীন গুহাভূমি ত্যাগ করে আরও দক্ষিণে গমন করে।

এই প্রাগৈতিহাসিক যাযাবরদের ইতিহাস রচনার অবকাশ ঘটেনি কোনও যুগান্তরেই। কেবল প্রতিটি নূতন সূর্যালোকের নবীন আলোস্পর্শে ভীমবেটিকার গুহাগাত্রে জাগ্র ও তাদের সময়ের অঙ্কিত বিভিন্ন চিত্রশৈলী অতীতকে বর্তমানের সাথে সংযুক্তি ঘটায়। সেই সব অনুপম গুহাচিত্রের মধ্যে একটি অপরিণত শিশুর করস্পর্শের ছাপ গুহাগাত্রে আজও রয়ে গেছে প্রকৃতি ও মানবকের সংগ্রামের ক্ষুদ্রকায় অবশেষরূপেই।



No comments:

Post a Comment