প্রিয় স্বাধীনতার বিবর্ণ কোলাজ
রাণা চ্যাটার্জী
স্বাধীনতা (১)
"স্বপ্ন দেখায় স্বাধীনতা"
চায়ের দোকানে সকালে রবীন, ঝাঁপি খুলতেই,ওপারে রেললাইন থেকে ঝুপড়ির হই চই শব্দ,গান ভেসে আসা শুনতে পায়।রোজ দেখে চেনা কালু,পটলা,ইসলাম,জোসেফরা সকাল হলেই কাগজ কুড়োনোর ফাঁকা বস্তা পিঠে সফর শুরু করে। নোংরা আবর্জনা ঘেঁটে,পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতল, ফেলে দেওয়া এটা সেটা কুড়িয়ে তারপর আয়েস করে চা,টোস্ট ,ঘুগনি,খেতে আসে পরম শান্তিতে রবীনের দোকানেই।
কোনো দিন দোকান ফাঁকা পেলে,সমবয়সী এদের সাথে ,ওদের দু দন্ড জিরোনোর সময়, ভাব বিনিময় হাসি,মস্করা করার সুযোগ হয়ে যেত।সকাল সন্ধ্যা, জল ঘেঁটে কাপ,প্লেট ধোওয়া স্যাঁতসেঁতে হাতে, মা মরা,বারো বছরের রবীন
মালিক না থাকলে কাজ চালিয়ে নেবার মালিক হয়ে উঠতো।খুশি হয়ে, কখনো কেমন বিস্কুট বা চা'য়ের দাম কম করে এদের কাছ থেকে নেওয়ার চেষ্টা করবে কি ,হার না মানা নাছোড়বান্দা,লড়াই করা এরা কিছুতেই সে রাস্তায় হাঁটবে না।
জোর করে টাকা মিটিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচবে এই সেনাপতির দল।এগুলো ভীষণ ভাবে স্পর্শ করে রবীন কে।সেও উপলব্ধি করে,কিছু না থাকা মানুষগুলোর অভিমান একটু বেশি হয়,যেমন তার মা মারা যাবার পর সংসারটা ভেসে গেলেও কাকার পরিবারে হাত পেতে কেবল কি করে খাবে,এটা মেনে নিতে কষ্ট হবে বলে জোর করে চায়ের দোকানে কাজে ঢুকেছে।
হাড় লিক লিকে ,পাকানো,শীর্ণ শরীরের দশ বারো বছর বয়সী ওদের মুখে পয়সা বাঁচানোর কথা,বাড়ির বাজার খরচা,কেউ নিজেদের মধ্যে মায়ের ওষুধ কেনার কথা বললে,নিঃশব্দে রবিনের মনটা বিহ্বল ও চোখের কোণ ভিজতো।
দেখতে দেখতে আজ ,আর একটা, প্রজাতন্ত্র দিবস উৎযাপনের শুরু,কানে ভাসছে কুচকাওয়াজ।প্যারেড মাঠে কদিন থেকে মহড়া শুরু হয়েছে ...।
টিউশন করে আসার পথে আমিও দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, পতাকা উত্তোলন,কুচকাওয়াজ,
বন্দে মাতরম ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশ ।স্বাধীন ভারতের এই যে সম্মান প্রদর্শন করার চিরাচরিত পদ্ধতি দেখে মন,ভরে যাবার মুহর্তেই ভিড়ের মাঝে পিঠে প্লাস্টিক,ছেঁড়া কাগজ বোঝার বস্তা নেওয়া মুখ গুলো দেখে ত্রি রঞ্জিত গর্বের পতাকা কেমন জানি একটু বিবর্ণ রংচটা লাগছিল,হয়তো ওদের ফ্যাকাশে মুখের প্রতিফলন। ভাবুক মন যেন তখনো কল্পনায় দেখছিলো ওদের এন.সি.সির খাঁকি পোষাকে প্যারেড মাঠে,জয়হিন্দ ভঙ্গিমায়।
বেলা গড়িয়ে গেছে অথচ ওরা আসছে না টিফিন করতে! এঁটো কাপ ,প্লেট ধুতে ধুতে রবীনও বেশ উসখুস করছে ।হাতের কাজ সামলে একটু আসছি বলে মালিকের অনুমতি নিয়ে বেলার দিকে ওপাড়ার দিকে পা বাড়াতেই দেখে প্যারেড মাঠ থেকে ফিরে ও গুলো কি সুন্দর ভাবে প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করার চেষ্টায় রত হয়েছে।আর কেউ কাজে বের হয় নি,ছিটেবেড়া ,ভাঙা চোরা দেয়ালে কেউ নেতাজি,কেউ ক্ষুদিরাম কেউ ভগৎ সিংয়ের ছবি,কাগজের পতাকা গুলোকে, কি সুন্দর ভাবে সাজিয়ে রেখেছে।
হেঁটে যাওয়া পথচলতি সকলকে হাসিমুখে লজেন্স
দিয়ে জোড়হাত করে বার্তা দিচ্ছে ওরা "কাকুরা যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না "
রবীন ও একটা চকলেট মুখে,গর্বিত শ্বাস নিয়ে,
পতাকা হাতে পা বাড়ালো চা দোকানের দিকে।
ততক্ষণে জমে যাওয়া আরও এক গামলা এঁটো বাসন,রবীনের কচি দুটো হাতের অপেক্ষায়...।
মালিকের রেডিও তে ভেসে এলো,কোন এক জনদরদী নেতার উন্নত ভারত গড়ার স্বপ্ন বার্তা,এক গুচ্ছ ফিরিস্তি।!জয় হিন্দ।শুভ হোক প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠান বিবর্ন ,রংচটা স্বাধীনতার প্রতিবিম্বে।
স্বাধীনতা(২) : "গরম ভাত"
গত বছর সেদিনটা ছিল ১৬ই আগস্ট, স্বাধীনতা দিবস পালনের ঠিক পরের দিন । আমার অফিস শহর বীরভূম জেলার সাঁইথিয়া । আহা মরি সপ্রতিভ শহর না হলেও আর পাঁচটা মফস্বল শহরের থেকে ব্যবসা বাণিজ্য প্রসারে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে বলাই যায়।
সাঁইথিয়া স্টেশন এ নেমে বাইরে মেন রোডের ভীড় ভাট্টা যানজট এড়িয়ে মাঝে মধ্যেই শর্ট কাট অলি গলি, তস্য গলি ,বসতি এলাকার এঁদো পথ পেরিয়েই অফিস পৌঁছে যাই। কখনো কেমন আপন মনে হলেও নজর এড়ায় না কর্ম চাঞ্চল্য বসতি জীবন ,ছোটো ছোটো তাদের নিকানো ঘর দোর । দরজায় বাঁধা ছাগল এর পাশে বসে স্কুল যাবার প্রস্তুতিতে কোনো ছাত্রীর খেতে বসা । কখনো ছোট ছোট পুচকে খুদে বাচ্চাদের রান্না বাটি খেলার দৃশ্য ভীষণ মন ভালো করে অন্য ভাবনায় নিয়ে ফেলে আমার কাল্পনিক মনন চিন্তনকে। আবার খালি গায়ে এক নাগাড়ে কেঁদে চলা বাচ্ছা টিকে ফেলে ,উনুনের আগুন জ্বালিয়ে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা কোনো মায়ের ।
আপাত সস্তা মালে ঠাসা মুদির দোকানে দু পাঁচ টাকার তেল নূন কেনার ভিড় ঠেলে আমার পথ চলার গতিময়তার মাঝে সেদিন একটু গতি শ্লথ হয়ে পড়ে এক বিশেষ ঘটনায়। নজরে পড়েছিল,ভিজে যাওয়া জ্বালানি কাঠ ,কঞ্চিতে ভরসা না করতে পেরে লাইট পোস্ট সহ এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আগের দিনের লাগানো ছোটো ছোটো কাগজের পতাকা গুলো কে সংগ্রহ রাখা এক বস্তা থেকে বার করছে চুলে জট পাকানো ওই হাড় লিকলিকে ক্ষয়িষ্ণু মা।
বয়স,বছর বাইশ তেইশ হবে,কি হবে না কত আপ্রাণ প্রচেষ্টায় সে, কিছু শুকনো বাঁশ পাতা ,কাঠ গুঁড়ির সাথে দুমড়ে মুচড়ে ওই প্লাস্টিক ও কাগজের পতাকা গুলো চুলায় গুঁজছেন আর ফুঁ দিয়ে ভাত ফোটানোর স্বস্তিতে ! পাশে হামাগুড়ি আর কাদা মাটি মাখা ল্যাঙটা বছর দেড়েকের কুচকুচে ,কোলের গোপাল তখনও খিদের জ্বালায় কেঁদেই চলেছে। কখনো উনুনের হটাৎ আগুন শিখায় হয়তো বা ভাতের গন্ধ পেয়ে মা কে দেখে চুপ। এক অন্য স্বাধীনতার ঘ্রাণ নিয়ে পায়ের গতি বাড়ালাম অফিসের দিকে।
স্বাধীনতা-৩
" মমতা ময়ী"
মা তো মা'ই হয় ,দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে কি তার তুলনা চলে! পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে হতে পারে বাড়ির অভিভাবক হিসাবে তাকে অনেক কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়,স্বামী যুৎসই বা দায়িত্ব সম্পন্ন না হলে, এগিয়ে আসতে হয় মা কেই।নিজের সন্তানের ভালোর জন্য অনেক মা'য়ের, অন্যদের চোখে নানান তকমা জোটে তবু সব কিছু ছাপিয়ে মা তো মা'ই।সন্তান,পরিবারের কাছে মায়ের ভূমিকা সত্যিই অপরিসীম,এর কোনো বিকল্প নেই।
প্রতিদিনের মতো দৌড় ঝাঁপ করে অফিস যাবার ট্রেন ধরতে স্টেশনে আসা।ট্রেন লেট হলে প্যাসেঞ্জার দের ভিড়ে একটু বসলেই এক দৃশ্য, মন কে বেশ নাড়া দেয় আবার অদ্ভুত এক ভালো লাগা। এক শীর্ণকায়,দুস্থ ,জন্ম থেকেই এভাবে স্টেশন চত্বরে কাটানো অভাবী এক মা ,দেখি একদম ছোট ওই বছর দেড়েকের বাচ্ছা মেয়ে টা কে হাঁক দিয়ে ডাকে! কড়া চোখে একটু শাসন করে ধুলো বালি মেখে মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়া বাচ্ছা টি কে! প্যান্ট না পড়া দেখলে রেগে যায়,অন্য একটি বাচ্ছা খুঁজে এনে দেয় প্যান্ট তৎক্ষণাৎ।
আমি বসে দেখি সে সব দৃশ্য।তারপর নিয়ম করে ওই মহিলা টিফিন বক্স বার করে পরম যত্নে মেয়েকে খাইয়ে দেন।সেই ঘড়ি ধরা এক সময়,আট টা কুড়ি। কোথা থেকে সে খাবার জোগাড় করে,ঠিক সময়ে বেরিয়ে গিয়ে আবার এনে খাইয়ে দেয়,আর ততক্ষণ বাচ্ছা টি ওই আর একটু বড় দাদাটির কাছে খেলে।খাবার বার করার সময় বুভুক্ষু ওই বাচ্চাটির চোখ মুখের আনন্দ,উদগ্রীবতা আমায় উদাস করে কোন অচিনপুরে নিয়ে চলে যায়!
হয়তো বাচ্ছা টি কোনোদিন চোখেও দেখেনি কে তার বাবা,বাবার কি দায়িত্ব ! সেসব বড়ো জটিল প্রশ্ন ওই খিদেতে অপেক্ষারত ছেলেটির,কিন্তু সে জানে খিদে পেলে মা ঠিক এসে তাকে দু মুঠো খাইয়ে যাবে।আর এই খানেই নাড়ির টান, মায়ের হৃদয়।এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর অন্য স্বাধীনতার গন্ধ গায়ে মেখে আড়ালে আজ ছবি তুলে আমার গন্তব্যের ট্রেন ধরতে পা বাড়ালাম।
.
স্বাধীনতা-৪
"অস্তগামী "
বহু ঘটনা,লড়াইয়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা আজ প্রতিফলিত, ভিখারিনী অসহায়ের শতচ্ছিন্ন শাড়ি নগ্নতায়,দুমুঠো ভাত ফোটানোর প্রয়াসে,"সবার জন্য ঘর","অনাহারে না মরা"র" প্রকল্পের ফাঁসে।
স্বার্থপরতা,রেষারেষি,দখলদারি বন্ধুত্বের ফাটলে মায়ের কোলও খালি করে।'মহিলা,বাচ্ছা শিশু,বয়স্কা কেউ কি সুরক্ষিত!
অল্পে সন্তুষ্টির দিনবদলে,ঝাঁ চকচকে দেখনদারি,
শপিংমল,পাঁচতারায় মুক্তি খোঁজে স্বাধীনতা। বেলেল্লাপনার আসরে,"এখনই পেতে হবে"নেশায় দিগভ্রান্ত যুবসমাজ,আগুনমুখী ঝলসানো পতঙ্গ।
শৈশবে কাগজ,রিফিল,পেন্সিল ফুরালে,
হাপিত্যেশে অপেক্ষা,কবে বাবা কিনে আনবেন!ছিল এক মাধুর্য মাখা ধৈর্য্যের পরীক্ষা। এখন বেড়েছে প্রাচুর্যতা,সুযোগ,কমেছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা,আন্তরিকতা।
অন্ধ ভিক্ষুক,কানাইয়ের বাচ্ছাটি ,হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেল!চোখের জল মুছে,পেটের দায়ে, আবার ভিক্ষাপাত্র নিয়ে কানাই রাস্তায়।ব্যস্ত মানুষের ভিড়ে অলক্ষ্যে পাত্রে অচল পয়সার ঝনঝনানি।চোখের জলের হয়না কোনো রং,তবু বেঁচে থাকে সবুজ প্রত্যাশা।
ট্রেনে ভয়ভীতিতে বৃহন্নলা বাহিনীকে লহমায় দশটাকা দেওয়া আমরাই,ল্যাংড়া,অপারগ,অন্ধকে কিছু দিতে ভাবি যতক্ষণ না,হৃদয় থেকে দয়ামায়ার ফোঁটা বর্ষিত হয়।
ছোটবেলার ডাংগুলি,হাডুডু,কাদা প্যাচপ্যাচে ফুটবলের রোমাঞ্চ আজ মুঠোফোনের দখলে জুয়া,সাট্টা,রুমি,নেশার মোড়কে।
স্বাধীনতার ফিস কবিরাজি ব্যঙ্গ করে কাঁচাপোস্ত, পেঁয়াজ,লঙ্কামাখা বাসি জলঢালা ভাত!তবু কুর্নিশ ,মাঠে ঘাটে,রোদে পোড়া
মেহনতী মানুষগুলোর,সমাজ গতিশীলতার তাগিদ।
আধুনিক স্বাধীনতার ঝলক,চেনা অচেনার গন্ডি ছাড়ায় আসল স্বাধীনতার অস্তগামী সূর্য হয়ে।
রাণা চ্যাটার্জী
স্বাধীনতা (১)
"স্বপ্ন দেখায় স্বাধীনতা"
চায়ের দোকানে সকালে রবীন, ঝাঁপি খুলতেই,ওপারে রেললাইন থেকে ঝুপড়ির হই চই শব্দ,গান ভেসে আসা শুনতে পায়।রোজ দেখে চেনা কালু,পটলা,ইসলাম,জোসেফরা সকাল হলেই কাগজ কুড়োনোর ফাঁকা বস্তা পিঠে সফর শুরু করে। নোংরা আবর্জনা ঘেঁটে,পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতল, ফেলে দেওয়া এটা সেটা কুড়িয়ে তারপর আয়েস করে চা,টোস্ট ,ঘুগনি,খেতে আসে পরম শান্তিতে রবীনের দোকানেই।
কোনো দিন দোকান ফাঁকা পেলে,সমবয়সী এদের সাথে ,ওদের দু দন্ড জিরোনোর সময়, ভাব বিনিময় হাসি,মস্করা করার সুযোগ হয়ে যেত।সকাল সন্ধ্যা, জল ঘেঁটে কাপ,প্লেট ধোওয়া স্যাঁতসেঁতে হাতে, মা মরা,বারো বছরের রবীন
মালিক না থাকলে কাজ চালিয়ে নেবার মালিক হয়ে উঠতো।খুশি হয়ে, কখনো কেমন বিস্কুট বা চা'য়ের দাম কম করে এদের কাছ থেকে নেওয়ার চেষ্টা করবে কি ,হার না মানা নাছোড়বান্দা,লড়াই করা এরা কিছুতেই সে রাস্তায় হাঁটবে না।
জোর করে টাকা মিটিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচবে এই সেনাপতির দল।এগুলো ভীষণ ভাবে স্পর্শ করে রবীন কে।সেও উপলব্ধি করে,কিছু না থাকা মানুষগুলোর অভিমান একটু বেশি হয়,যেমন তার মা মারা যাবার পর সংসারটা ভেসে গেলেও কাকার পরিবারে হাত পেতে কেবল কি করে খাবে,এটা মেনে নিতে কষ্ট হবে বলে জোর করে চায়ের দোকানে কাজে ঢুকেছে।
হাড় লিক লিকে ,পাকানো,শীর্ণ শরীরের দশ বারো বছর বয়সী ওদের মুখে পয়সা বাঁচানোর কথা,বাড়ির বাজার খরচা,কেউ নিজেদের মধ্যে মায়ের ওষুধ কেনার কথা বললে,নিঃশব্দে রবিনের মনটা বিহ্বল ও চোখের কোণ ভিজতো।
দেখতে দেখতে আজ ,আর একটা, প্রজাতন্ত্র দিবস উৎযাপনের শুরু,কানে ভাসছে কুচকাওয়াজ।প্যারেড মাঠে কদিন থেকে মহড়া শুরু হয়েছে ...।
টিউশন করে আসার পথে আমিও দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, পতাকা উত্তোলন,কুচকাওয়াজ,
বন্দে মাতরম ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশ ।স্বাধীন ভারতের এই যে সম্মান প্রদর্শন করার চিরাচরিত পদ্ধতি দেখে মন,ভরে যাবার মুহর্তেই ভিড়ের মাঝে পিঠে প্লাস্টিক,ছেঁড়া কাগজ বোঝার বস্তা নেওয়া মুখ গুলো দেখে ত্রি রঞ্জিত গর্বের পতাকা কেমন জানি একটু বিবর্ণ রংচটা লাগছিল,হয়তো ওদের ফ্যাকাশে মুখের প্রতিফলন। ভাবুক মন যেন তখনো কল্পনায় দেখছিলো ওদের এন.সি.সির খাঁকি পোষাকে প্যারেড মাঠে,জয়হিন্দ ভঙ্গিমায়।
বেলা গড়িয়ে গেছে অথচ ওরা আসছে না টিফিন করতে! এঁটো কাপ ,প্লেট ধুতে ধুতে রবীনও বেশ উসখুস করছে ।হাতের কাজ সামলে একটু আসছি বলে মালিকের অনুমতি নিয়ে বেলার দিকে ওপাড়ার দিকে পা বাড়াতেই দেখে প্যারেড মাঠ থেকে ফিরে ও গুলো কি সুন্দর ভাবে প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করার চেষ্টায় রত হয়েছে।আর কেউ কাজে বের হয় নি,ছিটেবেড়া ,ভাঙা চোরা দেয়ালে কেউ নেতাজি,কেউ ক্ষুদিরাম কেউ ভগৎ সিংয়ের ছবি,কাগজের পতাকা গুলোকে, কি সুন্দর ভাবে সাজিয়ে রেখেছে।
হেঁটে যাওয়া পথচলতি সকলকে হাসিমুখে লজেন্স
দিয়ে জোড়হাত করে বার্তা দিচ্ছে ওরা "কাকুরা যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না "
রবীন ও একটা চকলেট মুখে,গর্বিত শ্বাস নিয়ে,
পতাকা হাতে পা বাড়ালো চা দোকানের দিকে।
ততক্ষণে জমে যাওয়া আরও এক গামলা এঁটো বাসন,রবীনের কচি দুটো হাতের অপেক্ষায়...।
মালিকের রেডিও তে ভেসে এলো,কোন এক জনদরদী নেতার উন্নত ভারত গড়ার স্বপ্ন বার্তা,এক গুচ্ছ ফিরিস্তি।!জয় হিন্দ।শুভ হোক প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠান বিবর্ন ,রংচটা স্বাধীনতার প্রতিবিম্বে।
স্বাধীনতা(২) : "গরম ভাত"
গত বছর সেদিনটা ছিল ১৬ই আগস্ট, স্বাধীনতা দিবস পালনের ঠিক পরের দিন । আমার অফিস শহর বীরভূম জেলার সাঁইথিয়া । আহা মরি সপ্রতিভ শহর না হলেও আর পাঁচটা মফস্বল শহরের থেকে ব্যবসা বাণিজ্য প্রসারে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে বলাই যায়।
সাঁইথিয়া স্টেশন এ নেমে বাইরে মেন রোডের ভীড় ভাট্টা যানজট এড়িয়ে মাঝে মধ্যেই শর্ট কাট অলি গলি, তস্য গলি ,বসতি এলাকার এঁদো পথ পেরিয়েই অফিস পৌঁছে যাই। কখনো কেমন আপন মনে হলেও নজর এড়ায় না কর্ম চাঞ্চল্য বসতি জীবন ,ছোটো ছোটো তাদের নিকানো ঘর দোর । দরজায় বাঁধা ছাগল এর পাশে বসে স্কুল যাবার প্রস্তুতিতে কোনো ছাত্রীর খেতে বসা । কখনো ছোট ছোট পুচকে খুদে বাচ্চাদের রান্না বাটি খেলার দৃশ্য ভীষণ মন ভালো করে অন্য ভাবনায় নিয়ে ফেলে আমার কাল্পনিক মনন চিন্তনকে। আবার খালি গায়ে এক নাগাড়ে কেঁদে চলা বাচ্ছা টিকে ফেলে ,উনুনের আগুন জ্বালিয়ে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা কোনো মায়ের ।
আপাত সস্তা মালে ঠাসা মুদির দোকানে দু পাঁচ টাকার তেল নূন কেনার ভিড় ঠেলে আমার পথ চলার গতিময়তার মাঝে সেদিন একটু গতি শ্লথ হয়ে পড়ে এক বিশেষ ঘটনায়। নজরে পড়েছিল,ভিজে যাওয়া জ্বালানি কাঠ ,কঞ্চিতে ভরসা না করতে পেরে লাইট পোস্ট সহ এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আগের দিনের লাগানো ছোটো ছোটো কাগজের পতাকা গুলো কে সংগ্রহ রাখা এক বস্তা থেকে বার করছে চুলে জট পাকানো ওই হাড় লিকলিকে ক্ষয়িষ্ণু মা।
বয়স,বছর বাইশ তেইশ হবে,কি হবে না কত আপ্রাণ প্রচেষ্টায় সে, কিছু শুকনো বাঁশ পাতা ,কাঠ গুঁড়ির সাথে দুমড়ে মুচড়ে ওই প্লাস্টিক ও কাগজের পতাকা গুলো চুলায় গুঁজছেন আর ফুঁ দিয়ে ভাত ফোটানোর স্বস্তিতে ! পাশে হামাগুড়ি আর কাদা মাটি মাখা ল্যাঙটা বছর দেড়েকের কুচকুচে ,কোলের গোপাল তখনও খিদের জ্বালায় কেঁদেই চলেছে। কখনো উনুনের হটাৎ আগুন শিখায় হয়তো বা ভাতের গন্ধ পেয়ে মা কে দেখে চুপ। এক অন্য স্বাধীনতার ঘ্রাণ নিয়ে পায়ের গতি বাড়ালাম অফিসের দিকে।
স্বাধীনতা-৩
" মমতা ময়ী"
মা তো মা'ই হয় ,দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে কি তার তুলনা চলে! পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে হতে পারে বাড়ির অভিভাবক হিসাবে তাকে অনেক কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়,স্বামী যুৎসই বা দায়িত্ব সম্পন্ন না হলে, এগিয়ে আসতে হয় মা কেই।নিজের সন্তানের ভালোর জন্য অনেক মা'য়ের, অন্যদের চোখে নানান তকমা জোটে তবু সব কিছু ছাপিয়ে মা তো মা'ই।সন্তান,পরিবারের কাছে মায়ের ভূমিকা সত্যিই অপরিসীম,এর কোনো বিকল্প নেই।
প্রতিদিনের মতো দৌড় ঝাঁপ করে অফিস যাবার ট্রেন ধরতে স্টেশনে আসা।ট্রেন লেট হলে প্যাসেঞ্জার দের ভিড়ে একটু বসলেই এক দৃশ্য, মন কে বেশ নাড়া দেয় আবার অদ্ভুত এক ভালো লাগা। এক শীর্ণকায়,দুস্থ ,জন্ম থেকেই এভাবে স্টেশন চত্বরে কাটানো অভাবী এক মা ,দেখি একদম ছোট ওই বছর দেড়েকের বাচ্ছা মেয়ে টা কে হাঁক দিয়ে ডাকে! কড়া চোখে একটু শাসন করে ধুলো বালি মেখে মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়া বাচ্ছা টি কে! প্যান্ট না পড়া দেখলে রেগে যায়,অন্য একটি বাচ্ছা খুঁজে এনে দেয় প্যান্ট তৎক্ষণাৎ।
আমি বসে দেখি সে সব দৃশ্য।তারপর নিয়ম করে ওই মহিলা টিফিন বক্স বার করে পরম যত্নে মেয়েকে খাইয়ে দেন।সেই ঘড়ি ধরা এক সময়,আট টা কুড়ি। কোথা থেকে সে খাবার জোগাড় করে,ঠিক সময়ে বেরিয়ে গিয়ে আবার এনে খাইয়ে দেয়,আর ততক্ষণ বাচ্ছা টি ওই আর একটু বড় দাদাটির কাছে খেলে।খাবার বার করার সময় বুভুক্ষু ওই বাচ্চাটির চোখ মুখের আনন্দ,উদগ্রীবতা আমায় উদাস করে কোন অচিনপুরে নিয়ে চলে যায়!
হয়তো বাচ্ছা টি কোনোদিন চোখেও দেখেনি কে তার বাবা,বাবার কি দায়িত্ব ! সেসব বড়ো জটিল প্রশ্ন ওই খিদেতে অপেক্ষারত ছেলেটির,কিন্তু সে জানে খিদে পেলে মা ঠিক এসে তাকে দু মুঠো খাইয়ে যাবে।আর এই খানেই নাড়ির টান, মায়ের হৃদয়।এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর অন্য স্বাধীনতার গন্ধ গায়ে মেখে আড়ালে আজ ছবি তুলে আমার গন্তব্যের ট্রেন ধরতে পা বাড়ালাম।
.
স্বাধীনতা-৪
"অস্তগামী "
বহু ঘটনা,লড়াইয়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা আজ প্রতিফলিত, ভিখারিনী অসহায়ের শতচ্ছিন্ন শাড়ি নগ্নতায়,দুমুঠো ভাত ফোটানোর প্রয়াসে,"সবার জন্য ঘর","অনাহারে না মরা"র" প্রকল্পের ফাঁসে।
স্বার্থপরতা,রেষারেষি,দখলদারি বন্ধুত্বের ফাটলে মায়ের কোলও খালি করে।'মহিলা,বাচ্ছা শিশু,বয়স্কা কেউ কি সুরক্ষিত!
অল্পে সন্তুষ্টির দিনবদলে,ঝাঁ চকচকে দেখনদারি,
শপিংমল,পাঁচতারায় মুক্তি খোঁজে স্বাধীনতা। বেলেল্লাপনার আসরে,"এখনই পেতে হবে"নেশায় দিগভ্রান্ত যুবসমাজ,আগুনমুখী ঝলসানো পতঙ্গ।
শৈশবে কাগজ,রিফিল,পেন্সিল ফুরালে,
হাপিত্যেশে অপেক্ষা,কবে বাবা কিনে আনবেন!ছিল এক মাধুর্য মাখা ধৈর্য্যের পরীক্ষা। এখন বেড়েছে প্রাচুর্যতা,সুযোগ,কমেছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা,আন্তরিকতা।
অন্ধ ভিক্ষুক,কানাইয়ের বাচ্ছাটি ,হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে মারা গেল!চোখের জল মুছে,পেটের দায়ে, আবার ভিক্ষাপাত্র নিয়ে কানাই রাস্তায়।ব্যস্ত মানুষের ভিড়ে অলক্ষ্যে পাত্রে অচল পয়সার ঝনঝনানি।চোখের জলের হয়না কোনো রং,তবু বেঁচে থাকে সবুজ প্রত্যাশা।
ট্রেনে ভয়ভীতিতে বৃহন্নলা বাহিনীকে লহমায় দশটাকা দেওয়া আমরাই,ল্যাংড়া,অপারগ,অন্ধকে কিছু দিতে ভাবি যতক্ষণ না,হৃদয় থেকে দয়ামায়ার ফোঁটা বর্ষিত হয়।
ছোটবেলার ডাংগুলি,হাডুডু,কাদা প্যাচপ্যাচে ফুটবলের রোমাঞ্চ আজ মুঠোফোনের দখলে জুয়া,সাট্টা,রুমি,নেশার মোড়কে।
স্বাধীনতার ফিস কবিরাজি ব্যঙ্গ করে কাঁচাপোস্ত, পেঁয়াজ,লঙ্কামাখা বাসি জলঢালা ভাত!তবু কুর্নিশ ,মাঠে ঘাটে,রোদে পোড়া
মেহনতী মানুষগুলোর,সমাজ গতিশীলতার তাগিদ।
আধুনিক স্বাধীনতার ঝলক,চেনা অচেনার গন্ডি ছাড়ায় আসল স্বাধীনতার অস্তগামী সূর্য হয়ে।

No comments:
Post a Comment