Sunday, September 1, 2019

হিন্দুসভ্যতার মর্ম অনুসন্ধান - প্রাথমিকে প্রত্যাবর্তন

হিন্দুসভ্যতার মর্ম অনুসন্ধান - প্রাথমিকে প্রত্যাবর্তন

জয় রাজ 


পড়ার আগে ....
হিন্দু দর্শনের উপনিবেষিক ব্যাখ্যা এখনও মনে ধোঁয়াসা তৈরী করে।পাশ্চাত্য অনুসন্ধানকারীরা তাদের সঙ্কীর্ণ আব্রাহামিক দৃষ্টিভঙ্গী,নিম্নস্থরের সাংস্কৃতিক রুচীবোধ এবং সাম্রাজ্যবাদী অসৎ মানসিকতা দিয়ে হিন্দু সভ্যতার সম্পূর্ণ কাঠামোকেই তছনছ করবার চেষ্টা করেছে।হিন্দুর সভ্যতার বৈশিষ্ট্যগুলি কোনমতেই জুডাও-খ্রীষ্ঠান পরিভাষাতে সীমাবদ্ধ করা যায়না।আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাজগৎ ধীরে ধীরে উনবিংশ শতকের ব্যাখ্যার অপ্রতুলতা এবং তার যুক্তিপূর্ণ সংশোধনের অনুভব করছে।কিন্তু প্রাচীনপন্থী পশ্চিমী চিন্তাধারা এখনও সাধারনে প্রচলিত।ভারতীয় দর্শনকে কিছুমাত্র চর্চা করতে গেলে আমাদের চিন্তাজগতকে সম্পূর্ণ ভ্রান্তধারনার বোঝামুক্ত করতে হবে।
আর্য অনুসন্ধানের ভিত্তি
আর্যরা ভৌতিক জগতকে দুর্দমনীয় মুক্তমনে অনুসন্ধান করেছিলেন।তারা ভৌতিক জগতের সম্পর্কে  প্রশ্নাবলীর সমাধানে সীমাহীন সাফল্য পেয়েছিলেন।কিন্তু তারা কোনভাবে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে আমাদের ভৌত-রাসায়নিক দেহভান্ডটি মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র প্রতিরুপ।ব্রহ্মান্ড এবং মানবদেহের মধ্যে সমরুপ গঠন রয়েছে।সম্পূর্ণ ব্রহ্মান্ডের অনুসন্ধান কখনই সম্ভব নয়।তাই মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমরাদের উচ্চতর বৈচারিক সিদ্ধান্ত আত্মবিশ্লেষনের মাধ্যমেই কেবল মাত্র করতে পারি।এভাবেই আর্য আত্মঅনুসন্ধানের দীর্ঘযাত্রা শুরু হয়েছিল।  
আত্ম অনুসন্ধানের এককগুলি
শরীর,মন এবং চৈতন্য
মানুষ নিজেকে শরীর মনে করে যা কিনা মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।আমাদের মন যা চায় সেটাই শরীরের দ্বারা করতে চেষ্টা করি।শরীর ও মন উভয়কেই ভৌতবিজ্ঞান দ্বারা বিশ্লেষন সম্ভব।জৈব-পদার্থগত গঠনসমষ্টিটি হল শরীর...এবং কেন্দ্রীয় তন্ত্রে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল হল মন।কিন্তু আমরা কি?শরীর না মন? আমরা ভাবি এই দুই মিলিয়েই আমাদের সম্যক পরিচিতি।আমরা দুটির শুধু একটিকে আমাদের পরিচয় ভাবতে পারিনা আবার অনেকসময় দুটিকে একসাথে চালিত করতে পারিনা।যেমন আমরা অনেক সময় অনেক দৈহিক কার্য্যে লিপ্ত হই যেটা ধরা যাক চিকিৎসাগত বা নৈতিকতার নিয়মাবলীর বিরুদ্ধে...তাই আমাদের মন প্রতিরোধ করছে।ওই সময়ে আমরা শুধু রক্তমাংসের পিন্ড!আবার অনেক সময়, যেমন পক্ষাঘাতে,শরীর কাজ করা বন্ধ করে দেয়,তখন আর আমাদের নিজের শরীরের মালিক নই,কেবল মাত্র অকেজো শরীরের বন্দী মন।সেই সময়গুলিতে আমরা শুধু মন!কিন্তু আমাদের মনও সবসময় এক অবস্থায় স্থির নয়।যখন আমরা নিদ্রিত থাকি,কখন কখন আমরা বহুমাত্রিক স্বপ্ন দেখি,যা আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে একেবারে আলাদা।যাদের ভালবাসি অথবা ঘৃণা করি,বাস্তবের অথবা কল্পনার কোন স্থান যা আমাদের পছন্দের অথবা অপছন্দের,মহাকাব্যের কাহিনী ঐতিহাসিক চরিত্র কিংবা ছোটবেলার ঘুমপাড়ানী গান জীবনের ছন্দে পূর্ণ জীবিত হয়ে ওঠে।সেইসব স্বপ্ন আমাদের এতই প্রিয় যে আমরা অনেক সময় তাকে ছেড়ে আসতে চাইনা।এ যেন আমাদের দ্বিতীয় জীবন!কিন্তু জাগ্রত অবস্থায় এরা ফিরে আসেনা,মনেই লুকিয়ে থাকে।কখনও কখন নেশা,মূর্চ্ছা বা কোমার স্থরে মন আমাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়।আবার কখনো কখনো জন্মগত বা আকস্মিক স্নায়ু-রাসায়নিক বা দৈহিক বিপর্যয়, আমাদের মনের ক্রিয়া আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।আমাদের শ্রমে অর্জিত বহুমুখী জ্ঞানভান্ডার বা দক্ষতা এক নিমেষে মুছে যায়!....তখনও আমরা হাসি তখনও আমরা স্বপ্ন দেখি...বাসনাও চিরকালের মতই সজীব থাকে....আমাদের আত্ম পরিচিতি হারিয়ে যাবার পরেও!সুতরাং মন কোন স্থায়ী অবস্থান নয়।বরং মনের বহুমুখী এবং অনিয়ন্ত্রিত গতিশীলতা রয়েছে।


আর্য অনুসন্ধানীরা মনকে নিয়ন্ত্রন করার প্রনালীর(যোগ) বিকাশ করেছিলেন এবং তার চলনের অভিমুখকেও স্থির করতে স্বক্ষম হন।মন অসীম বিশ্ব অনুসন্ধানের বাহন যার যাত্রা শুরু এই দেহে।কৃত্রিম উপগ্রহ যেমন উচ্চতর কক্ষপথে উড্ডীয়নের সময় তার জ্বালানী প্রকোষ্ঠ গুলি ক্রমান্বয়ে ত্যাগ করে তেমনি আমাদের প্রকৃত আত্মপরিচয়ে যাত্রায় শরীর ও মন ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যায়।আত্মপরিচয়ের এই তৃতীয় একক চৈতন্য।চৈতন্যকে আর আমাদের মনের প্রলম্বন বলা যায়না,যা এক অসীম সতন্ত্র স্বত্তা যা ভৌতরাসায়নিক অস্তিত্ব নিরপেক্ষ।বিভিন্ন শক্তির মন একে কেবলমাত্র আংশিক অনুভব করতে পারে।ভৌতিক অস্তিত্ব(শরীর ও মন) এবং চৈতন্যের মিথষ্ক্রিয়া জীবনকে ব্যাখ্যা বা পরিচালনা করে।বহু সহস্রাব্দব্যাপী গভীর ও ব্যাপক চৈতন্যের অনুসন্ধান যে সিদ্ধান্তসমূহের প্রতিষ্ঠা করেছে তাকেই সামগ্রিক ভাবে ধর্ম বলা হয়।বহির্জগৎ এবং অন্তর্জগতের সমরুপ তুলনামূলক বিশ্লেষন এই সিদ্ধান্ত সমূহের ভিত্তি।


No comments:

Post a Comment