Sunday, September 1, 2019

শ্যামা প্রসাদ সরকারের কবিতা

1.বসুধারা
________

সপ্তডিঙা মধুকর থেমেছিল ওই খানে,
দুজন সেথায় দেখতে পেল দুজনকে দুইজনে!
ফুলের সাজে বাজুবন্ধ, সবুজ ডুরে শাড়ি 
ঘুরতে ফিরতে এল সে মেয়ে কুম্ভকারের বাড়ি।

মাটির পুতুল নয়নলোভন ! ছয় কড়ি তার দাম 
চোখের কোলে সৌদামিনী ! এমনি দিয়ে দিলাম !

কোমল মেয়ে গঙ্গাপারের,অনেকদূরে বাড়ি
বসুধারার সঙ্গে মেলে মাটির হৃদয় তারি।
সেদিন রাতে জ্যোৎস্না যখন মলমলিয়ে আলো,
দোলমঞ্চে একলা মেয়ে কীর্তন শোনাল !
ফুলের মালাই গজমুক্তা গলায় যে তার দোলে
চন্দনেরই  মধুগন্ধ সোহাগে ভরিয়ে তোলে !

বহুকালের কত কথা গানের সুরে ভেসে
মাটির বুকে প্রথম আঁচড় পড়ল ভালবেসে।

নৌকা চলে দূর সীমানায় অগ্রদ্বীপে এসে
সেদিন মেয়ে বিয়ের কনে খবর এল শেষে!
কোথায় পাবে এমন মাটি ধূ ধূ বালির চর 
বসুধারা অন্য কারোর, অন্য কারো ঘর !

বিশাল গাঙে নৌকা ভাসাই ! যোজন দূরের পাড়ি 
তুফান ওঠে মাঝদরিয়ায় হল যে ছাড়াছাড়ি।

সেই থেকে আজ গহীন গাঙে,
ভাটিয়ালির গানে
জলের ঢেউ কলকলিয়ে 
মাটির কথা শোনে।

বসুধারা মাটির সাথে বেবাক মিশে রয়,
হাজার বছর পরেও যদি চিনতে পারা যায় !

2.প্রস্থান

চলে যাব ! তাড়া নেই
একমুঠো তন্ডুল শুধু
মুঠিতে নিয়েছি 
আজন্মকালের ঋণ,
শোধ হয়ে গেলে
নিষাদ অন্ধকার থামে !
তার কাছে ভিক্ষা নিয়েছি সময়
ততটা আগুন বিনিময়ে দিয়ে যাব।

দূরে তুমি সন্ধের শাঁখে;
এনেছ ধলেশ্বরী তীর 
মুথা ঘাসে পা'য়ের পাতা
ডুবে গেছে জন্মান্তরে। 


চলে  যাব ! তাড়া নেই,
দু'দন্ড রাত্রিকাল কেটে গেলে
হিম পড়ে ভিজেছে শরীর 
তবুও চেতনা জাগে 
একটু আগুন ধার দিও।
মালসায় ছোঁয়াচে তাপ
তারপর যেতে দিও।


3.আমার ছেলে
-------------------

এই তো পরবাস
বেয়নেটেতে পরমায়ু
শাণায় বারোমাস !
একটি করে সলতে নেভে
একটি করে জ্বালি
শঙ্খ বাজাই পুলিশ এলে 
তুলসীমঞ্চ খালি। 

আমার ছেলে একটি নয় গো
দেশের কাদামাটি 
সেই মাটিকেই দুধ দিয়েছি
থামিয়ে কান্নাকাটি !

ধান বুনেছি, মাছ ছেড়েছি
খোকন খাবে বলে 
আমার ছেলের পাঁজর ভেঙে
লক্ষ বুলেট চলে। 

আমার ছেলে একটি নয়গো
দেশের কাদামাটি 
সেই ছেলেকেই ঘুম পাড়ালাম 
ভিজলো শীতলপাটি !

খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো
ফিরল খোকা শেষে 
একটি বুলেট মাথার ভিতর
একটি পাঁজর ঘেঁষে।

ছেলের চোখে ঘুম নেমেছে
ঠান্ডা নিথর দেহে 
মায়ের চুমো আছড়ে পড়ে
নিবান্ধা কোন গেহে !

আমার ছেলে একটি কোথায়
হাজার জোনাক জ্বলে
নিথর হয়ে যতই ফিরুক
বারুদমাখা ছেলে !

অভিবাদন তো অনেক হলো
এবার বিদায় দিয়ে
লক্ষমানিক আকাশ ভরাক
তারার আলো নিয়ে !
মা হয়েছি নাড়ীর টানে 
কান্না কোথায় আর
বেটার বুকে তেরঙা বাঁধা
রক্তে রাঙা জোয়ার !
হাজার গেছে হাজার আছে 
শহীদ হল ছেলে 
মায়ের বুকে আকাশপ্রদীপ
পাঁজর জ্বেলে জ্বলে !

4.আগুন

সঙ্গে ছিলে, 
চিরটা কালের মিথ্যা  প্রতিশ্রুতি
জানিয়ে দিলে এক লহমায়
হঠাৎ  নিলে ছুটি।

আগুন ছিল, মালাও ছিল
মন্ত্র পড়েই ছোঁয়ার নিয়ম 
তাও তো সুরের ছন্দপতন
বন্ধ হল রোশনচোকী
সঙ্গে ছিলে, শুধুই না কি?

হাতের উপর আবিশ্ব তুমি
উপুড় হয়ে ঘুম পাড়ালে 
চন্দনকাঠ অরণি এনে 
অনল এনে ঘর পোড়ালে 
ছাই তো থাকে, সেটুক আজও
উড়িয়ে দিয়ে আমায় খোঁজো!

কে এরকম জানতো বল 
আগুন নিয়ে খেলতে গেলে 
দুহাত জুড়ে তাপ লেগেছে 

কে এরকম জানতো বল 
নাম বদলেই যায় বদলে
দশটা বছর ইচ্ছা হলে !



No comments:

Post a Comment